খোয়াই শান্তিনিকেতন

খোয়াই

বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায় ।

আমি এরকমই একটা ভ্রমণ করতে চেয়ে ছিলাম যেখানে আমি ছাড়া কেউ নেই। আমার গুরু বলতেন : একা একা ভ্রমণ করতে কি ভালো লাগে? ন্যাড়া বোষ্টমী ছাড়া কি ভ্রমণ মানায় ? যা বেরিয়ে পড় দেখবি ন্যাড়া বোষ্টমী না পেলে কি হবে, রাস্তায় কুকুর দু -একটা সঙ্গে পাবিই। আমি খুঁজতে বেরিয়েছিলাম নিজেকে নিজের ভেতর দিয়ে।শুধু বাংলার প্রকৃতি ছাড়া  আমার কাছে কিছুই ছিলনা ।  বাংলা রূপ রসের গন্ধ ছিল আমার নাকে । আর ছিল কিছু নস্টালজিয়া । তাকেই হাতিয়ার করে বেরিয়ে পড়েছিলাম বীরভূমের গ্রামে ।

 মনে হয় যেন কোয়াই নদী।

প্রতিটা মানুষের বুকের ভেতর নাকি ৫ টি করে অদৃশ্য নীলপদ্ম থাকে। কেউ কাউকে ভালবাসলে সেই নীলপদ্ম তাকে দিয়ে দেয়। কেউ যদি তার কাছে থাকা ৫ টি নীলপদ্মই প্রিয় মানুষটিকে দিয়ে দেয়, তাহলে সে আর জীবনে অন্য কাউকে ভালবাসতে পারে না। এই তত্ত্ব  বাংলদেশের আসাদুল্লাহ সাহেবের।  তবে আমার কাছে আছে এখনো অনেক নীল পদ্ম । আর সবাইকে বলবো চল হে, চলো বেরিয়ে পড়ি। বুকের ভেতর বায়ু পরিবর্তন করে আসি । নীলপদ্ম ভালো লাগার মানুষদের বিলিয়ে দিয়ে আসি। বুকে বায়ু চলাচল করাই তো ভ্রমণ। যেখানেই চোখ মেলে তাকাবে সেখানে নিশ্চয়ই খুঁজে পাবে তাকে যে দাঁড়িয়ে আছে তোমার জন্য নীল পদ্ম হাতে।

আমি আজ কোন গ্রামে ভ্রমণ করতে আসেনি, এসেছি শান্তিনিকেতনের কাছে খোয়াইতে। আমি সেই সময়ের কথা বলবো তখন শনিবারের হাট বলে কিছু ছিল না। বোলপুর স্টেশন থেকে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি রুক্ষ প্রান্তরে ।

 খোয়াইয়ের তালতোড়ে বাতাস বইছে। তালপাতায় বাঁশি শব্দ পাচ্ছি । এই শব্দ আমার কানে ভাষা দেয়।

মন আমার কেমন কেন সাজেনা,

তবে কি ছেলেবেলা অনেক

দূরে ফেলে এসেছি 

আমি মেলা থেকে তাল পাতার

এক বাঁশি কিনে এনেছি।

 এই চিত্র সারা খোয়াইজুড়ে 

সেই গান আমার মনে পড়ে।  ভাবি ছোট বেলা সে কি ফের আসে? চারিপাশে  লাল মাটির রুক্ষতা। দূরে দেখতে পাই সাঁওতাল মেয়েটি নীল পদ্ম নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে । জুতো খুলে মনে হয় কাকরের রাস্তায় পা ফেলি । বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে রুক্ষতা। কেউ কোথাও নেই,সাঁকো পেরিয়ে গেলেই আমতলা শ্মশান। রুক্ষতার সাথে মিশে গেছে আমার শরীর। রুক্ষতার মাঝে  তৈরি হয়েছে  বল্লভপুর অভয়ারণ্য।কান পাতলে শোনা যায় হরিণের পায়ের শব্দ। প্রকৃতির এক অদ্ভুত রূপ। লাল কাপড়ে মাটি  ক্ষয়ে ক্ষয়ে এক অদ্ভুত অবয়ব। কেন মরুভূমির প্রান্তরে  এসে পড়েছে। বৃষ্টি যখন পড়ে  মনে হয় যেন লাল বৃষ্টি হচ্ছে। আর বৃষ্টির জলে  তৈরি হয় ছোট ছোট নদী। কাগজের নৌকা যদি ভাসিয়ে দেয়া যায় চলে যাবে কোপাই নদীতে। আমার শরীরে যেন প্রবেশ করেছে সাঁওতাল পরগনা।

 দিয়ে আঁকব এই রুক্ষতার ছবি? রামকিঙ্কর  বলতেন,
গাছপালা ,নদী, আকাশ, মানুষ অবিকল আঁকা করলে ওটি আঁকা হয় না । মন আঁকে । শুধু চোখ আঁকা করে না... । নন্দলাল বসু বললেন হে কিঙ্কর তুমি যে ফটোর চেয়ে বেশি দেখতে পাও এটি শিল্পীর দেখা। ফটোগ্রাফ যন্ত্রের দেখা। তুমিও মনে-মনে আঁকো।কেবল চোখে দেখে আঁকো না ।
আমি মানুষ দেখি । এখানে মানুষ নির্বিকার। মুখে কোন শব্দ নেই। আপন গতিতে চলেছেন। আদিবাসী রমনীর মুখে তেল চুঁয়ে ঘামে  মিশে গিয়ে কালোর সৌন্দর্যকে আরও  বাড়িয়ে তুলেছে । নীলকণ্ঠ পাখি দেখার ইচ্ছে আমার নেই । নীল পদ্ম হাতে যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে আমি তার কাছে যেতে চাই । ভ্রমণের ঝুলি নিয়ে রাস্তায় বের হয়েছি । শ্যাম বাটি ফলস  পার করে যাব এবার আরো দূরে । পলাশ গাছে পাতা এসেছে, ফুল নেই। বুনো কুল গাছ এঁকেবেঁকে লতিছে। দাঁড়িয়ে পড়ি তালতোড়ের সামনে। খুঁজি ছায়া। এখানেই আমার সাথে দেখা হয়েছিল কলা ভাবনের অরুণিমার । দেখি একা একা বসে খোয়াই আঁকছে। রেল লাইন প্রান্তিক স্টেশনে এসে মিশবে । অনেক দূরে সেতু দেখা যাচ্ছে। গুহার ভেতর দিয়ে মিশে যাবে লুপ লাইন । যাবো কী সেই গ্রামে যেখানে কোন এক ছবিওলা অপেক্ষা করছেন আমার জন্য। সেও সারাদিন ছবি আঁকতো মনে মনে। ঘুড়ির কাগজে আঁকা ছবি । জল রঙের ছবি। প্রেমের ছবি।

ঝোলা থেকে কাগজ পেন বের করি । উই পোকার ঢিবিতে শরতের আকাশে রামকিঙ্করের মুখ মুখ খুঁজে পাই । কোন রঙে আঁকলে দেখতে পাবো খোয়াই বেড়ানোর মুখ ? আকাশ যত নীল, মাটি তত লাল ।  আকাশমণি গাছের পাতা এতটুকুও নড়ছে না । নীল কণ্ঠ পাখির কোন শব্দ নেই । মন বলছে, সে হয়তো হয় দাঁড়িয়ে আছে আমার জন্য । যাকে আমি  নিরিবিলি সাঁওতাল দিঘিতে ডুবিয়ে রেখে এসেছি। 

 বর্ষাকালের রূপ 

রবীন্দ্রনাথ লিখছেন "দুপুর বেলায় মাঠের ভিতর খোয়াইয়ের মধ্যে একটা গুহার ছায়ায় পা ছড়িয়ে দিয়ে বসতুম, সামনে দিয়ে ক্ষীণ জলস্রোত বালির উপর দিয়ে বয়ে যেত, আপনাকে রীতিমত কবি বলে মনে হত। বুনো খেজুর গাছে ছোটো ছোটো খেজুর ফলে থাকত, সেগুলো খেতে আদবেই ভাল লাগত না, কিন্তু তবু মরুপ্রান্তরের মধ্যে বুনো গাছ থেকে বুনো ফল স্বহস্তে পেড়ে খাচ্ছি এই মনে করে একটা বিশেষ গর্ব অনুভব করতুম। এই খোয়াইয়ের মধ্যে আমানিডোবা বলে একটি ছোট্ট ডোবা ছিল, তার মধ্যে খুব ছোট্ট মাছ থাকত, কাপড়-চোপড় খুলে সেই ডোবার মধ্যে গিয়ে পড়তুম—মনে হত নির্ঝরের জলে স্নান করছি।’
প্রান্তিক রেলস্টেশনের গায়ে ছোট্ট একটা চায়ের দোকানে বসে পড়ি । খোয়াইয়ের ভেতর দিয়ে একটা নদী বয়ে যাচ্ছে। ছোটবেলায় জানতাম  এই নদীর নাম খোয়াই।

 বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের আঁকা ছবি


নদীটি শ্যামবাটিতে মিশে তৈরি হচ্ছে শ্যামবাটি  ফলস। নদী কখনো হারিয়ে যাচ্ছে কখনো বুকের কাছাকাছি চলে আসছে। খোয়াই নদীর  ধার দিয়ে যেতে যেতে আমি খুঁজতাম  বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়, নন্দলাল বসু, রামকিঙ্কর বেইজকে।
শান্তিনিকেতন পোস্ট অফিসের পাশ দিয়ে একটা রাস্তা ছিল। সেই রাস্তা ধরে সরাসরি খোয়াইতে পৌঁছানো যেত।
আমি আর দিলীপ সেদিন ওই রাস্তা ধরেই ফিরছিলাম। আকাশ কালো করে এসেছে। বৃষ্টি আসবে আসবে ভাব ঠান্ডা বাতাসে লাগছে। হঠাৎ করে শুরু হল প্রবল ঝড়। কোন রকমে আমরা মাথা ঘোরার চেষ্টা করছি। সেই সময়ের দিলীপ বললো : রাস্তার দিকে তাকাও। তাকিয়ে দেখি কালো রাস্তা দেখা যাচ্ছে না শুধু আমার আম। আমরা দুজনে বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে ভিজতে ভিজতে  আমগুলো কুড়োতে লাগলাম। সেই আম জামায় বেঁধে নিয়ে এলাম রামকিঙ্করের তৈরি করা কালো বাড়িতে। দিলীপ তখন ব্ল্যাক হাউজেই থাকতো। আমিও তার অতিথি। বহু বছর তার সাথে দেখা নেই। শুনেছি সে এখন  দিল্লির একটি আর্ট স্কুলের শিক্ষক বা কলেজের অধ্যাপক।

বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের আঁকা

 

খোয়াই ঘুরতে ঘুরতে একটু বসে পড়ি। ভাবি এমনি করে দিন যদি যায় যাক না । প্রতিটি দিনই ক্ষণকালকে ধরে রাখতে চায় । দুঃখ অথবা বিরোধের মধ্যে দিয়ে ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় আপন শক্তি দিয়ে প্রতিটি দিন কি অতিক্রম করতে হয় । প্রতিটি দিনই কোথায় যেন জগতকে বড় করে তোলে । সংসারে রূপান্তর ঘটায় । জীবন থেমে থাকে না ।  মনের ভেতরের দুঃখগুলো পাখির মতো উড়তে থাকে। প্রান্তিক স্টেশনের লেভেল ক্রসিং এর দিকে তাকিয়ে থাকি।লেভেল ক্রসিং পার হলেই রাস্তা চলে গেছে কঙ্কালীতলার  দিকে।  মনে হয় এখানে একটা ঢাকি পাড়া ছিলো । সে পাড়া থেকে ভেসে আসত পুজোর শব্দ । বিশ্বকর্মা পুজোর দিন  (মনসা পুজোয় )গ্রাম থেকে বের হয়ে আসত ঢাকিরা । পৃথিবী জোড়া এই জটিল পার্বণ যেন উদযাপিত হয়ে চলে  ঢাকের আওয়াজে ।



 অনবদ্য খোয়াই 

সময়টা হঠাত্‍ একটা জায়গায় এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে ।মনে হলো বন্য যাচ্ছে সাইকেল করে।এই বন্যকে  আমি খোয়াই ঘুরিয়ে দেখিয়ে ছিলাম। আসা যাওয়া পথের ধারে বসে শুনেছিলাম  বাউল গান। আমি যে পান্থ জনের সখা। বারবার মনে হয় কাঁচা হাঁড়িতে রাখিতে নারিলি প্রেমজল ।  আসার দিন তাকে একা ফেলে চলে আসি মামা ভাগ্নে পাহাড়ে।
যাচ্ছি কঙ্কালীতলা । যাব কিনা এই ভাবনায় ভাবিত হয়ে পড়লাম । কেন যাব ? কোপাই নদী দেখব ? কিছু দিন আগে আমি পল্লব দা , নিখিল দা এসে ছিলাম গাড়ি নিয়ে ।নিখিলদা মারা যাবার পর একবারও ইচ্ছে করে না এই পথে যেতে । ভাবছি ফিরে আসি। কাছারিপট্টিতে গিয়ে বিস্টুদার দোকানে দানাদার মুড়ি খাবো আর লাইনের  ওপারে গিয়ে দিঘির পাড়ে মাছ ধরবো।

ছবি  মন বন্দ্যোপাধ্যায়  ও সংগৃহীত।


মন্তব্যসমূহ

  1. উত্তরগুলি
    1. Bama da, apurbo apnar chinta Shakti. Khub valo lagey apnar lekha porte. Ekdom alada swad. Jakhon e samay pabo apnar lekha porte chai.

      মুছুন
  2. কি সুন্দর লিখছেন। বহুবার গেছি।

    উত্তরমুছুন
  3. আপনার সাথে সাথে আমিও ঘুরছি।

    উত্তরমুছুন
  4. অাপনার লেখার ধৈর্য কে কুর্নিশ।

    উত্তরমুছুন
  5. অনবদ্য লেখনী,খুব ভালো লাগলো।লেখা চালিয়ে যান।আপনার সৃজনশীলতার সুখ্যাতি না করে পারছি না। ভালো থাকবেন।

    উত্তরমুছুন
  6. আমি ঘুরে এলাম শান্তিনিকেতন।সোনাঝুরি এখন অন্যরকম খোয়াই নদী তো বোঝাই যায় না। ভালো লিখেছেন।

    উত্তরমুছুন
  7. অসাধারণ লেখা আর তথ্য

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মধেরার সূর্য মন্দির

মিশর ভ্রমণের নান্দীমুখ।

হালিশহর এক দিনের ভ্রমণ।