পথে পথে ভ্রমণ

পথের সাথে পথের মাঝে

বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায় ॥

তিনি বলেছিলেন না ,পথের শেষ কোথায় ? এই সত্য মাঝে   মাঝে চমকে দেয় । সত্য উপলব্ধির পেছনে গোলকধাঁধার মত ঘোরা।কখনো জলযাত্রা ,কখনো বা চড়াই-উতরাইয়ের পথে ।মাঝে মাঝেই বৈরাগীর বুকের ভেতর লুকিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে, এই সত্য কে বুঝে। ইচ্ছে করে পালিয়ে  যেতে। রাতের ট্রেনে চেপে ঘন ধোঁয়া  ভেতরে। কিন্তু যাব কোথায় ? চল বিহারে ? কোন বিহারে? সারা ভুবন জুড়েই তো বিহার ! আহার আর বিহার এই করেই তো জীবন কেটে গেলো । ভাবি কৃষ্ণের পথে যাব । সেখানেও জটিলতা আছে । ন্যাড়া বোষ্টমী লাগে । বৃন্দাবনের পথে যাব পথ দেখাবে কে ? 

 পথ চলেছে বৈরাগীদের বুকে 

 ঘুমের ঘোরে দেখলাম যারে  চেতন হয়ে পাইনে তারে। লুকাইলে কোন শহরে নব রসের রাসবিহারী।।মেঘে যেমন চাতকেরে দেখা দিয়ে ফাঁকে ফেরে। লালন বলে তাই আমারে করলো গৌর বরাবরই।। বৃন্দাবনের পথে গেলে অনেক সাধনা করতে হবে , হাতে অতো সময় কোথায় ? যাক একটু পুরাণের পথ ধরেই হাঁটি সেখানে একটু অমৃত যদি পাওয়া যায় ? আমার যাত্রা এবার অমৃতের পাদদেশে । মরিতে চাহিনা এই সুন্দর ভুবনে । অমৃত তো পাবোনা !  ঘ্রাণে যদি অর্ধ ভোজন হয় । যেখানে যাব সেখানে ঘ্রাণও নেই, আছে পাথর । বলি ভ্রমিতে চাই এই সুন্দর ভ্রমণে ।

 মন্দার পর্বত 

দেবতারা সমুদ্র মন্থনের আয়োজন করেন । কিন্তু এই কষ্ট সাধ্য কাজশুধুমাত্র দেবতাদের করা কষ্ট সাধ্যতাই শিবের পরামর্শে অসুরদেরও সমুদ্রমন্থনে আহবান করা হয় ।

অসুরেরা এই শর্তে রাজী হয় সমুদ্র মন্থন থেকে যা প্রাপ্ত হবে তার অর্ধেক অসুরদের দিতে হবে।যথা সময়ে সমুদ্র মন্থন শুরু হল । মন্দার পর্বত কে বাসুকী নাগ দ্বারা বেষ্টিত করে যখন মন্থনের প্রথম দড়ি টানা হল তখন মন্দার পর্বত নিচের দিকে যেতে শুরু করল।এমতাবস্থায় ভগবান বিষ্ণু কুর্ম অবতার গ্রহন করল অর্থাত্ কচ্ছপের রুপ ধারণ করলেন এবং পর্বত কে নিচের পিঠের উপর স্থাপন করলেন । এতে করে পর্বত টি নিচের দিকে যাওয়া থেকে বেঁচে গেল। সমুদ্র মন্থনে সর্ব প্রথমই হলাহল নামে এক বিষ উঠে আসল।যার ফলে সমস্ত ব্রহ্মান্ডের বায়ু বিষাক্ত হয়ে গেল।অনেক দেবতা আর অসুর সেই স্থানেই মুর্ছা গেল।তখন সেই বিষ ব্রহ্মার কাছে গেল, ব্রহ্মাও এই বিষ কে গতি প্রদান করতে অসমর্থ হল। তারপর বৈকুন্ঠে বিষ্ণুর কাছে গেল, বিষ্ণুও অপারগতা প্রকাশ করল । শেষ পর্যন্ত শিব সমস্ত সংসারের মঙ্গলের জন্য এই হলাহল বিষ পান করল ।তখন  পার্বতি ছুটে এসে ভগবান শিবের কন্ঠ টিপে ধরলেন যেন মহাদেবের দেহ পর্যন্ত এই বিষ না যায় । বিষ গুলো তখন গলাতেই আটকে থাকল এবং মহাদেবের কন্ঠ নীল হয়ে গেল ।  

 জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে ফিরছেন 

সেই মন্দার পর্বত এর কাছেই যাচ্ছি আমরা । যাওয়ার সহজ পথ ভাগলপুর থেকে ট্রেন যাচ্ছে মন্দার হিল । আমি অত সহজ পথে যায়নি । সহজ পথে আমার কোন দিনই  যাওয়া হলো না । সহজিয়া পথ খুঁজি হয়ে যায় জটিল ।আমি সাঁইথিয়া গেলাম, চপ মুড়ি খেলাম, সেখান থেকে বাস ধরলাম দুমকা যাওয়ার । দুমকার বাসে চেপে ঘণ্টাখানেকের পথ পুরো সাঁওতাল পরগনা ভেদ করে চলেছে আমাদের বাস । এখান থেকে রিখিয়া যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও যাওয়া যায়।কবি বিষ্ণু দে, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত তাদের বাড়ি  এই রিখিয়ার কাছে । সাঁওতাল পরগনার একটা নিজস্ব প্রকৃতি আছে । পাহাড়িয়া নিঃশব্দ গলা টিপে ধরার মুহূর্তে মনে হবে কে আমায় এনেছিল ভুলিয়ে ভুলিয়ে এই সাঁওতাল পরগনায় ! দুমকা থেকে ভাগলপুর গামী বাসে যাচ্ছি মন্দার পর্বত এর দিকে । রাস্তার দু'পাশে গরল পাথর যেন পড়ে আছে । এদের দেখতেই তো আসা । সমুদ্র মন্থন করার সময় ঘর্ষনে ঘর্ষনে  পাহাড় গুলো  ছিটকে ছিটকে পড়েছিল চারিদিকে সেগুলোই আজ রাস্তার দুই পাশে পড়ে আছে ।  বংশী থেকে নেমে মন্দার যেতে হয় । হাঁটা পথ গাড়ি ও পাওয়া যায় । অদ্ভুত নিরাপত্তাহীন পথ যেতে হেটে সময় লাগে মিনিট ৪০।দেড় হাজার ফুট পাহাড় ওঠার আগে স্নানটা সেরে নিতে পারেন পাহাড়ের কোলে বিরাট দীঘির জলে। সাঁতার না কাটায় ভালো বড় বড় পাথর এবং শ্যাওলা বিপদ ডেকে আনতে পারে । পাহাড়ে ওঠার আনন্দ মানেই তারপর কি আছে দেখার । রাস্তার ধারে ধারে পাথর কেটে কেটে বানানো রয়েছে নানান ধরনের মূর্তি । মন্দার যেমন হিন্দুদের পবিত্র ধর্মস্থান তেমনি জৈনদের কাছেও একটি পবিত্র স্থান । ছোট-বড় বেশ কয়েকটি জৈনধর্ম শালা আছে ।  সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনা । সারা মন্দার পর্বত এর গায়ে দড়ির দিয়ে পেঁচানো দাগ রয়ে গেছে । বাসুকী নাগ দ্বারা বেষ্টিত করে যখন মন্থনের প্রথম দড়ি টানা হয়েছিল সেই দাগ আজও স্পষ্ট । 

 এখন পাহাড়ের পদতলে  নৌকা বিহার

সারা রাস্তায় যেমন জৈনদের ১২ তম তীর্থঙ্কর বাসু পূজ্যর গল্প শোনা যায় তেমনি  মধুকৈটভেরও গল্প শোনা যায় । পাহাড়ের মাথায় রয়েছে বাসুপূজ্যের মন্দির । আমি প্রথম যখন যাই কোন লোহার রেলিং ছিলো না রাস্তার দুধারে । পাহাড়ের তলদেশে সুন্দর বাঁধানো ঘাট ছিল না । জঙ্গল আর জঙ্গল ছাড়া ছিলো কিছু গুম্ফা। এতো বছর আগে কোন শিল্পী তৈরি করে গেছেন অসাধারণ সব ভাস্কর্য ।বড় বড় পাথর কেটে সব মূর্তি । কোন নরম পাথর নয় শক্ত পাথরে এরকম মূর্তি করা বড় কঠিন কাজ । গণেশ, কালী, নৃসিংহ, বিশাল  মধুকৈটভ মূর্তি অবাক করে দেয় । যারা পাহাড়ে হেঁটে উঠতে পারবেন না তাদের জন্য ডুলির ব্যবস্থা আছে । এখানে রুক্ষ লাল মাটি নেই । আছে মহুয়া ফুলের গন্ধ । আদিবাসী মানুষের ভালবাসার মহুয়া রস ।আমরা ভাল্লুকের মতো সেই রসে নিজেদের ডুবিয়ে রাখি । মাথা ঝা ঝা করে । শরীরে জ্বর আসে । আবার পদ যুগল কে এগিয়ে নিয়ে চলি । ঘ্রাণেই যদি নাকি হয় অর্ধ ভোজন, তাহলে বার বার ঘ্রাণ নিলে কেন পূর্ণ ভোজন হয়না?এসেছি অমৃতের ঘ্রাণ নিতে !!! নিলাম মহুয়ার রস পুণ্য অমৃত ! এইতো মাটির কলসি । ভরা পূর্ণ অমৃত । পাউরুটি দিয়ে চুবিয়ে চুবিয়ে কতবার এই পুণ্য রস আস্বাদন করেছি!


আজ গৈ বী নাথের মন্দির 

ছোট্ট একটা গল্প বলে লেখা টা শেষ করবো । আমরা চার বন্ধু গিয়ে ছিলাম মন্দারহিলে রাত কাটবো বলে । জঙ্গল যদি মঙ্গল হয় হোক না । ক্ষতি কি আছে? হেঁটে হেঁটে পৌঁছে গেছি পাহাড়ের মাথায় । সূর্য তখন ডুববে । এক ধর্মশালায় আশ্রয়  নেওয়ার চেষ্টা করলাম । ধর্মশালায় ছিলেন কালো পোশাক পরা একজন সাধু বাবা । কিছুতেই তিনি আমাদের থাকতে দিলেন না । এমন হুংকার দিলেন যাতে আমরা ওখান থেকে পালিয়ে যাই । রাত হয়ে গেছে পাহাড় থেকে নেমে আসার কোনো উপায় নেই । কি করি ? ঘন অন্ধকার রাস্তায় ভাল্লুকের ভয় ।  অন্ধকারে খুঁজতে খুঁজতে একটা ছোট্ট গুহা পাওয়া গেল সেই গুহার মধ্যে ছিল দুটো গরু । আমরা চারজন  আশ্রয় নিলাম গোয়াল ঘরে । সারা রাত্রি ঘুম নেই । একটু শব্দ পেলেই ভয়ে গুটিয়ে যাচ্ছি । ভয়ে মুখে কোন কথা নেই । সেই রাত এতো দীর্ঘ ছিল যে কোন ভাবে যে ভোর হতে পারে সেটাই মাথায় আসছিল না । সেই ভ্রমণে অমৃত পাথর দেখার বদলে , সারা শরীরে মেখে গিয়ে ছিল গোবর আর গোমূত্র। পাহাড়ের কোলে টলটল করছে জল । লাল সালুক ফুটে আছে চারিপাশে । তাতেই অবগাহন করে পূর্ণ ও পূণ্য স্নান করলাম ।

মন্তব্যসমূহ

  1. উত্তরগুলি
    1. খুব ভাল লাগলো - আপনার লেখার সাথে সাথে আমার মানস ভ্রমণ হলো - অনেক অজানা জানা হলো - অনেক ধন্যবাদ - ভালো থাকবেন ।

      মুছুন
  2. খুব সুন্দর লেখা এপথ আমরাও ঘোরা। পঁয়ত্রিশ বছর আগে।আবার ঘুরে এসেছি গতবছর।সব কিছুই নতুন নতুন লেগৈ

    উত্তরমুছুন
  3. অসাধারণ বর্ণনা, মানস ভ্রমণ করে নিলাম, 60 বছর বয়সে কি আর পারবো ওখানে যেতে! যা পেলাম আপনার বর্ণনায় তাতেই মুগ্ধ হলাম। ধন্যবাদ আপনাকে, ভালো লাগলো খুবই 🌷🌷

    উত্তরমুছুন
  4. সুন্দর লেখা। শুভেচ্ছা রইল।

    উত্তরমুছুন
  5. বিহারের এই জায়গা গুলোতে যাওয়া হয় নি

    উত্তরমুছুন
  6. খুব ভালো লাগছে আপনার অভিজ্ঞতার বর্ণনা।

    উত্তরমুছুন
  7. অনবদ্য পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ,ভালো লাগলো,শুভেচ্ছা।

    উত্তরমুছুন
  8. বিহারের এরকম অনেক ছোট ছোট জায়গা আছে। আমরা ভ্রমণ করতে চাই না। কিন্তু একবার গেলে জায়গাগুলো আপন হয়ে যায়। আপনার লেখার মধ্যে খুব সুন্দর জায়গা খুঁজে পেলাম খুঁজে পেলাম

    উত্তরমুছুন
  9. এই মন্তব্যটি একটি ব্লগ প্রশাসক দ্বারা মুছে ফেলা হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  10. বেড়ানোর খাতা নামে একটি চমৎকার ব‌ই হতে পারে! ভ্রমণের বৈচিত্র্যময় স্বাদ,বর্ণনা, অজানা অনেককিছু তথ্যসংযোজন প্রতিটি লেখায় এক অতিরিক্ত আস্বাদন যুক্ত করে। আপনাকে অনেক শুভেচ্ছা ‌ও অভিনন্দন। লেখা চলতে থাকুক।

    উত্তরমুছুন
  11. অসাধারণ অসাধারণ মন্তব্য করার ভাষা খুজে পাওযা কঠিন।

    উত্তরমুছুন
  12. শেষটা দারুণ। কষ্টকর অথচ রোমাঞ্চকর।
    ঘুরে নিলাম মন্দার পাহাড়।

    উত্তরমুছুন
  13. রোমাঞ্চকর লেখা, ভালোই।

    উত্তরমুছুন
  14. অসাধারণ, খুব ভালো লাগলো লেখাটা পড়ে।

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মধেরার সূর্য মন্দির

মিশর ভ্রমণের নান্দীমুখ।

হালিশহর এক দিনের ভ্রমণ।