ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণ

 বিদেশ

দেনপাসারের বালি 

বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায়

প্রথমে ভেবেছিলাম। ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা যাব। পরে ঠিক করলাম জাকার্তা কেন যাব? ইন্দোনেশিয়া যদি যেতেই হয় তবে বালি যাব। বালি দ্বীপে যেতে মন টানে, কেননা কোথাও যেন একটা টান অনুভব করি। মনে হয় সেখানে রামায়ণ আছে। শিল্প আছে। অসাধারণ সব সীবিচ আছে।

প্রাচীন বালিতে পসুপ্ত, ভৈরব, শিব সিদান্ত, বৈষ্ণব, বৌদ্ধ, ব্রহ্মা, ঋষি, সরা ও গণপতি শুধু যে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের আবাস ছিল তা নয় প্রত্যেক সম্প্রদায়ের লোকজন তাঁদের নির্দিষ্ট দেবতার পুজো দিতেন। বালীয় সংস্কৃতির পুরোটাই ভারতীয়। তবে চীনাদের দ্বারা প্রভাবান্বিত। প্রথম শতক থেকে হিন্দু সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে। 

 বালির সিম্বল। বাড়ির গেট।

প্রাচীন ও আধুনিক নৃত্যকলা, ভাস্কর্য, চিত্রকলা, চামড়া, ধাতবশিল্প ও সঙ্গীতের মতো উচ্চ পর্যায়ের শিল্পকলা  শহরে বিশেষ গুরুত্বতা পেয়েছে। সাংবার্ষিক ইন্দোনেশীয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব এখানে অনুষ্ঠিত হয়। কৃষি প্রধান একটি দ্বীপ  শতকের গোড়ার দিকে পর্যটন শিল্পের দিকে ঝুঁকে পড়ে ।

সীতা উদ্ধারের জন্য রামচন্দ্র সুগ্রীবের সাথে মিত্রতা করেন। শর্ত স্থির হয়, রাম সুগ্রীবের ভাই বালীকে হত্যা করবেন এবং তার বিনিময়ে সুগ্রীব সীতা সন্ধানে ও সীতা উদ্ধারে রামকে সহায়তা করবে।দু’বারের প্রচেষ্টায় রাম আড়াল থেকে বালীকে হত্যা করতে সফল হন।প্রথমবার সুগ্রীব পরাজিত হয়ে পলায়ণ করেছিল। দ্বিতীয়বার যখন সুগ্রীব আবারো পরাজিত হচ্ছিল বালির কাছে ,তখন আড়াল থেকে তীর নিক্ষেপ করেন রামচন্দ্র, বীর বালির মৃত্যু হয় কাপুরুষ রামের হাতে।  ভূমিতে লুটিয়ে পড়ে বালি।

সে রামকে জিজ্ঞেস করে, 

 ” হে রাম! তুমি একটি মহান বংশে জন্মেছ, তুমি এক সুবিখ্যাত রাজার পুত্র, মেধাবী, সুদর্শন , ও সৎকর্মা হয়ে , অন্যের সাথে যুদ্ধরত অবস্থায় আমাকে আহত করে তুমি কি গুণ লাভ করলে?” বালিকে হত্যা করে রাম সুগ্রীবকে  কিষ্কিন্ধ্যার সিংহাসনে বসান। সুগ্রীব আবারো বালির স্ত্রী ‘তারাকে ‘ অধিগ্রহণ করে। সুগ্রীবের সাহায্যে সীতা সন্ধান ও উদ্ধারের জন্য সুগ্রীবের মনোষ্কামনা পূর্ণ করেন রাম  । সারা বালিতে সুগ্রীবের কোন চিহ্ন নেই , তাই আজও বলিতে বালিই রাজা । 

 রাস্তায় চলছে ধর্মীয় অনুষ্ঠান 

ধান ভাঙতে শিবের গাজন গেয়ে ফেললাম । বালি শব্দটা রামায়ণ থেকে রবীন্দ্রনাথ , নদীতে সাগরে মিশে গেছে বালি । রবীন্দ্রনাথ বলতেন বালি  শব্দটা ছোট।  প্রদেশটাও ছোট কিন্তু এর মধ্যে নিজস্বতা আছে । রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন তাঁর পুত্রকে বালি দ্বীপটা ছোট । সেই জন্যেই এর মধ্যে এমন একটি সুসজ্জিত সম্পূর্নতা । গাছেপালায় পাহাড়ে -ঝর্ণায় মন্দিরে মূর্তিতে কুটিরে ধানে খেতে হাটে বাজারে সমস্তটা মিলিয়ে যেন এক । বেখাপ কিছু চোখে ঠেকে না । আমি বালি ভ্রমণ নিয়ে লিখবো না । লিখবো দু একটা না ভ্রমণের শিল্প কথা । বালির শিল্প প্রথাগত শিল্পের বাইরে । বালি শিল্প কোন ফ্রেম নয় । উন্মুক্ত । সমস্ত দরজা খোলা । বাতাস বইতে পারে । যতগুলো  মন্দির বা বৌদ্ধদের গুম্ফামন্দির দেখেছি  সবই উন্মুক্ত।দুটো দরজা এক করে দিলে বন্ধ করা যায় । দরজা আছে কিন্তু উন্মুক্ত। যেন একটা পাহাড়টাকে কেটে দুভাগ করা  হয়েছে ।  এমন একটা বাড়ি নেই যার সামনে মূর্তি নেই । বিশ্বের সব চেয়ে বড় ইসলামিক দেশের বালি প্রদেশে বৌদ্ধদের আর হিন্দুদের সংস্কৃতির বিচরণ চমকে দেয় । এ যেন আগ্নেয়গিরির শিখরে পিকনিক !   

 বালির বীচে 

      রাস্তায় দু’ধারে বালিনিজদের অত্যন্ত দৃঢ় সংস্কৃতির ছাপ ।  বালিনিজরা ঐতিহ্যে খুব বিশ্বাসী। বাড়ির মূল ফটকে ওরা এমন স্থাপত্য শিল্প ব্যবহার করে যা দেখলে একশ’ বছরের পুরোনো মনে হয়। ফুল এবং বাঁশের ব্যবহার সর্বত্র চোখে পড়ার মতো। বাঁশকে নানাভাবে সাজিয়ে বিভিন্ন বাড়ি, মন্দির, দোকান ইত্যাদিতে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে তাতে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। চীন ও ভারতীয় শিল্পের মিশ্রণ ।

আগ্নেয়গিরির শিখরে  পিকনিক

 দূরে দেখা যাচ্ছে আগ্নেয়গিরি 


কিন্তামানি মাউন্ট বাতুর, জীবন্ত আগ্নেয়গিরি দেখার উদ্দেশ্যে গিয়েছিলাম । সেখানে পৌঁছে চারপাশের দৃশ্য এতটাই সুন্দর দেখলাম যে আমরা বিমোহিত হয়ে গেলাম। জায়গাটি বালির পূর্ব দিকে। বেশ কিছুটা রাস্তা উঠে গেছে। সেখানে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকি পাহাড় আর আগ্নেয়গিরি।১ হাজার ৭০০ মিটার উঁচু এই পর্বতে একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরি রয়েছে, পাহাড় বেয়ে ছড়িয়ে থাকা শীতল লাভা পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মাউন্ট বাতুরের পাদদেশে আছে বালির সর্ববৃহৎ প্রাকৃতিক লেক বাতুর। পাহাড়ে বসে হ্রদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য পাহাড়ের ওপর ছোট ছোট রেস্তোরাঁ গড়ে তোলা হয়েছে, আমরা সেখানে বুফে লাঞ্চ করলাম, সেই বুফে খাবারের স্বাদটাও দারুণ ছিল। সঙ্গে ছিলো হোটেলর দুজন বাদ্যকর । তারা  বালীর লোক সংগীতের সুরে বাজালেন জলতরঙ্গে মতো একটি যন্ত্র দিয়ে । ২০১৯ সালে এখানেই আগ্নেয়গিরি জেগে উঠলো । দু কিলোমিটারের  অনেক মধ্যে অনেক ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে । জানি না এই সুন্দর রেস্তোরাঁ আর আছে কি না ?

 রেস্তোরাঁতে বাদ্য বাজিয়ে অভ্যর্থনা 

রাস্তার দু’পাশে কাঠের, মাটির, পাথরের তৈরি অবাক করা বিভিন্ন কারুকাজখচিত শিল্প দেখে চিন্তামণি কর , রামকিঙ্কর , শর্বরী রায় চৌধরী দের মনে করিয়ে দেয় । বারবার নজর কাড়ছিল। বালিতে তেমন কোনো সুউচ্চ ঘর-বাড়ি আমাদের চোখে পড়েনি। গ্রামে গ্রামে বাটিক শিল্প । ভারতের এমন কোথাও দেখিনি একঘণ্টা বাস পথে জুড়ে আছেন রামকিঙ্কররা । গ্রাম যে শিল্প হতে পারে তা কখনো ভাবিনি । কৃষিকে শিল্প করে তুলেছে । এমন সবুজকে দেখে মনে হয় ক্যানভাস । ধান চাষকে নিয়ে গেছে নন্দলাল বসু , বিনোদবিহারি বা বিকাশ ভট্টাচার্যের ছবিতে । এখানে ছবিগুলোয় এখন যুরোপিয়ান ঘরানা  ঢুকে পরেনি । ইন্দোনেশিয়ার এখন চর্চিত লেখক পারটিওনি জুলিআনি  ২৭ বছরের এই মেয়েটি কদিন আগে একটি বই প্রকাশ করেছেন । বইটির নাম আতারাকশ লুম্বা - লুম্বা । যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ডলফিন সার্কস । বহু বছর ধরে ইন্দোনেশিয়ার পুরনো খেলা ডলফিন সার্কস। রাজধানী জাকার্তায়, কোরিয়ায় জনপ্রিয় হলেও  বালিতে তাঁর কোন প্রভাব নেই । মানব মনের জটিলতা নিয়ে বইটি লেখা । বালির মানুষের মধ্যে সে জটিলতা প্রবেশ করিনি । আটপৌরে উদাসীন মানসিকতা । শিল্পরা রর্দর নাম জানার তাগিদ নেই । শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বছরে একবার ঘর আর শিল্প কাজ গুলোকে পরিস্কার করতেই হবে । লেখাটা শেষ করতে চাই ইন্দোনেশিয়ার এক বিখ্যাত কবির কবিতা দিয়ে 

 বালির সানসেট পয়েন্ট 


আমি 

কবি আনোয়ার  লেখা 

যখন আমার যাবার সময় হয়ে যাবে । 

তখনও আমি কারুর কাছে নিজের জন্য ভিক্ষা চাইব না । 

এমন কি তোমরা কাছেও না । 

আমি চাই না কারুর করুনা । 

আমি সেই বিখ্যাত বন্য পশুর বিভাগের মধ্যে পড়ি  যেখানে অন্য পশুর কোন স্থান নেই  ।  আমি বুঝতে পারি বিস্ময়কর বিষ  আমার শরীরে বয়ে চলেছে । আর এই বিষকে পাত্তা না দিয়ে হাজার বছর ধরে আমি বেঁচে থাকতে চাই । 


* অনুবাদ ভালো করতে পারিনি বলতে পারেন ভাবানুবাদ

মন্তব্যসমূহ

  1. নতুন করে বালি দেখলাম।

    উত্তরমুছুন
  2. Lekhati porey khub bhalo laglo. Samogro Bali k anubhab korlam.

    উত্তরমুছুন
  3. Ki sundar barnona karechen. Apnar lekha pare itihas er anek kichu jana jai. Asadharan. Bhalo thakben.

    উত্তরমুছুন
  4. Last month I visited bali for 11 days. Besides art in every nook and corner, I found the attitude and behaviour of the people are so cordial which I have not seen any where in the world. The beach and waterfslls are mesmerizing. In every house Gajpati Bappa is there in entrances. The best tourist place in the world.

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. খুব সুন্দর বলেছেন। দারুন আপনার অভিজ্ঞতা। আপনার নামটা যদি একবার বলেন। ভালো লাগবে।

      মুছুন
  5. খুব সুন্দর বলেছেন। দারুন আপনার অভিজ্ঞতা। আপনার নামটা যদি একবার বলেন। ভালো লাগবে।

    উত্তরমুছুন
  6. অসাধারণ একটি লেখা।

    উত্তরমুছুন
  7. অপূর্ব,লেখনী তে বালী অপরূপ দৃশ্য চোখের সামনে ফুটে উঠেছে।মনে হচ্ছে চলে যাই সেই পবন পুত্র দের দেশে।

    উত্তরমুছুন
  8. সব গুলোর মত এটাও খুব সুন্দর লিখেছ। শুভেচ্ছা রইল।

    উত্তরমুছুন
  9. বিদেশে আমি যাইনি কোনদিন। সেরাম ভাবনা আমার নেই। কিন্তু লেখার মধ্যে বিদেশের গন্ধ নেই বলছি একটা স্বদেশী আনার মুন্সিয়ানা

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. অনেক শুভেচ্ছা নেবেন। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে

      মুছুন
  10. খুব সুন্দর হয়েছে কাকু

    উত্তরমুছুন
  11. খুব সুন্দর লিখেছেন ।

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মধেরার সূর্য মন্দির

মিশর ভ্রমণের নান্দীমুখ।

হালিশহর এক দিনের ভ্রমণ।