অজয় নদীর তীরে

পদপল্লব মুদারম ও জয়দেব মেলা

বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায় ।

কবি জয়দেব তাঁর কাব্যগ্রন্থে ‘স্মরগরল খণ্ডনং, মম শিরসি মণ্ডনং, দেহি পদপল্লব মুদারম’ (তোমার গরল নাশকারী চরণপদ্ম আমার মাথায় দাও, আমার দেহমনের বিরহ শীতল হোক )। এই একটি লাইন লেখার জন্য যে ব্যাকুলতা দেখিয়েছিলেন। সে ব্যাকুলতাকে উপলব্ধি করার একটা ভাবনা এসেছিল মাথায় । এবার আমি জয়দেব মেলায় যাবো । দেখে আসবো জয়দেবের ভূমি । অজয় নদ ।  লক্ষ্মণ সেনের গড় । তখন আমি তরুণ তুর্কি । একা একা চলে যাই  অচেনা গ্রামে । কাঁধে ব্যাগ সঙ্গে কবিতার বই । কাগজ কিছু । একটা গামছা । যে সব বন্ধুরা টিউশন করত তাদের কাছেই  হাত পেতে  চেয়ে নিতাম কিছু টাকা ।

 কবি জয়দেবের মন্দির

 তখন মাথায় গিজগিজ করতো তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।  শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের  ঘুণপোকা আমার মাথায় কুড়ে খেত। এই বুঝি ফজল আলি আসছে । মাথায় মেঘ ঢুকে পড়বে । তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে আমাদের বাড়ির একটা সুসম্পর্ক ছিলো। ছোট বেলায় দেখেছি ওনাকে আমাদের বাড়িতে । সেই বীরভূমের লাভপুরে তার বাড়ি। বীরভূম আমার কাছে খুবই  প্রিয় জায়গা । এর মধ্যে হলো কি সমরেশ বসুর সাথেও আলাপ হয়ে গেল। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কে গুরু হিসেবে মানতেন  সমরেশ বসু।  তার কাছে শোনা এবং পড়া কিছু গল্পের মধ্যে একটা গল্প সমরেশ বসু বলতেন, গুরু আমায় একা বেড়িয়ে পড়ার কথা বলতেন । মনে মনে ভাবি, আমি কি একা বের হতে পারবো? প্রাণে বায়ু পরিবর্তন , আর প্রাণে বায়ু চলাচলি কি হবে?

 পুণ্য স্নান 

টিপ টিপ করে বৃস্টি পড়ছে । বোলপুর স্টেশন থেকে বেরিয়েছি। স্টেশনের গায়েই দাঁড়িয়ে আছে বাস  ' জয়দেব জয়দেব'  বলে হাঁকাহাঁকি করছে। পৌষ সংক্রান্তির শীত।পৌষের শীত মোষের গায়ে। আমার গায়ে বাবার কাছে ধার নেওয়া তুষের চাদর । জয়দেব মেলায় যখন পৌঁছলাম তখনও বৃস্টির রেখা ধোঁয়া ধোঁয়া । আমায় যেতে হবে কদম্বখণ্ডির কাছে ক্ষ্যাপা মনোহর দাসের আখড়ায় । আমার কাকা আগের দিন চলে গেছেন । ওখানের এক তাঁবুকে থাকার ব্যবস্থা । দাঁড়ালাম মনোহর দাসের আখড়াতে। মনোহর ক্ষ্যাপা নামেই বেশি পরিচিত তিনি। এ এমন এক আখড়া, যা সবাই চেনে, সবাই একবার ঘুরে যায়, যেন মেলার মধ্যে আর এক তীর্থক্ষেত্র। বাউলরাও অন্তত একটি গান গেয়ে যান এই আখড়ায় । সনাতন দাস ,পূর্ণচন্দ্র দাস, গোষ্টগোপাল দাস, বিশ্বনাথ দাস, পবন দাস । তিন দিন ধরে বাউলের সাথে  থাকা ।  সে তো আশ্চর্য রূপরেখার  ভ্রমণ । গোষ্টগোপাল দাস আমার পাশে বসে গল্প করছেন । বাড়ির খরব নিচ্ছেন কে  কেমন আছে । নেবার একটা কারণও ছিলো। গীতাদি (নাম   ভুল হতে পারে আমার স্মরণে গীতাদিই ) সাথে  গোষ্টগোপাল দাসের প্রথম বিয়ের পর আমাদের বাড়িতে এসে কদিন ছিলেন ।  

 আখড়াতে চলছে গান 

প্রথম রাতটা বিভিন্ন আখড়ায় কাটিয়ে দিলাম । পরের দিন কাকার খু্বই শরীরটা খারাপ করেছিল দুই রাত জেগে  ছিলেন ।  মনোহর দাসের আখড়া পরিচালনা করতেন আমার কাকা গৌরীপদ গঙ্গোপাধ্যায় । সন্ধে বেলা কাকা আমায় ডেকে বল্লো,  আজ তোকে আখড়া চালাতে হবে । আমি কিছু্ই জানি না আমি আখড়া চালাবো ! ! সেই সময় আমার কাছে বসে,  সবচেয়ে নমস্য বাউল ব্যক্তিত্ব বাউল শ্রী সনাতন দাস । তিনি শুনে বললেন , কীরে ক্ষ্যাপা ভয় পাচ্ছিস কেন পারবি পারবি । আসল বাউল বলতে যা বোঝায় তিনি হচ্ছেন সেই দরের বাউল ছিলেন সনাতন দাস। ছোট বয়সে রবীন্দ্রনাথকেও গান শুনিয়েছিলেন । আমি এসেচি মুক্ত খাঁচায় । বন্ধনে আমার মুক্তি নেই। এসেচি জীবন দর্শন টর্শন ভেবে নয় , দেহতত্ত্বের ভাবনাও নেই । একটা ভাবনা আমার মাথায় ঘুরছিল সেটা হচ্ছে কবি জয়দেবের একটি লাইন দেহি পদপল্লব মুদারম। সেই রাতে আমি পবন দাসের প্রথম গান ' খেজুর গাছে হাড়ি বাঁধ মন '  শুনেছিলাম । ভোর হতে সামান্য দেরি দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায় উঠলেন গান গাইতে। শেষ গানটা গাইলেন । শেষের দিনে সেজন বিনে পর কি কখনো আপন হয়।  বিশ্বাস হচ্ছিল না , অঝোরে কাঁদছেন আখড়ায়  বসে থাকা কয়েক হাজার মানুষ । এটাই কী তাহলে জয়দেব বলে গিয়েছিলেন ? মৃত্যুর আগেই কি বলে  যাওয়া দেহি পদপল্লব মুদারম ? 

 সূর্য নিভে আসছে জয়দেব মেলায় 

কদমখন্ডির ঘাটে গিয়ে দেখি অজয়ের জল উল্টোদিকে বইছে না। জয়দেব কে নাকি মা গঙ্গা বলেছিলেন তোকে আর কাটোয়ার গঙ্গায় মকর  স্নান করতে যেতে হবে না,  আমি তোর কাছে যাব।  তুই দেখবি অজয়ের জল উল্টোদিকে বইছে , তখনই  বুঝবি আমি এসে গেছি। 

কাল রাতে শুনেছিলাম, একজন বাউল আখড়ায় গাইছিলেন সোলা ডোবে পাথর ভাসে এমনি মহিমা অজয়ের জলে । এখানেই ছিল রাজা লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি জয়দেবের নিবাস। আমারতো মনে পড়ছিল রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতাটা। আমাদের ছোট নদী চলে আঁকে বাঁকে। আমি পার হয়ে গেলাম হেঁটে হেঁটে  অজয় নদ । ঠান্ডা জলে পা মনে হচ্ছে কেটে যাচ্ছে ।বীরভূম জেলা থেকে চলে এলাম বর্ধমান জেলায়। নদের এপার আর ওপার । জঙ্গলের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন গড় । এটা নাকি লক্ষ্মণ সেনের গড় । কী সুন্দর লাগছে সে নদটিকে । কেন যে কেউ লিখলেন না  অজয় পাড়ের বৃত্তান্ত । কত কত ইতিহাস ঘিরে রয়েছেই নদটিকে নিয়ে । আমি ভ্রমণ করি, মানুষ দেখি । আমি ভাবি কখনো , না জল কী তোমার কোন ব্যাথা বোঝে কিনা । যাকে জয় করা যায় না সেই তো অজয় । তা  হলে জয় দেব কী করে জয় করেছিলেন । তিনি কবি কুমুদ রঞ্জন মল্লিক,অজয়কে নিয়ে লিখেছিলেন বাড়ি আমার ভাঙন ধরা অজয় নদীর বাঁকে,/জল যেখানে সোহাগ ভরে স্থলকে ঘিরে রাখে"" 

 অজয় নদীতে চলছে স্নান 

অজয়ের ভাঙনেতে করে বাড়ি ভঙ্গ,তবু নিতি নিতি হেরি নব নব রঙ্গ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অজয় নদীর দ্বারা প্রভাবিত হয লিখেছিলেন । "চাঁদের কিরণ পড়ে যেথায় একটু আছে জল যেন বন্ধ্যা কোন্ বিধবার লুটানো অঞ্চল।নিঃস্ব দিনের লজ্জা সদাই বহন করতে হয়,আপনাকে হায় হারিয়ে-ফেলা অকীর্তি অজয়।"

 কবি জয়দেব

গীতগোবিন্দ রচয়িতা কবি জয়দেবের মতোই আমরাও একই  অবস্থা । কী লিখবো বুঝতে পারছি না । লিখবো ভ্রমণ তা না হয় লিখছি কবিতার কথা । গীতগোবিন্দ রচনা সময় দশম সর্গের নবম পদে এসে আটকে যান কবি জয়দেব । স্মরগরল খণ্ডনং, মম শিরসি মণ্ডনং,এই পর্যন্ত লেখার পর তিনি লিখতে চেয়েছিলেন 'শ্রীকৃষ্ণ রাধার চরণ ধরিতে চাইবেন । অথচ তার বারবার মনে হয়েছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড যার পায়ের তলায় সে কি করে রাধার পা ধরবে ? এই পর্যন্ত লিখে তিনি আটকে গেলেন । ভাষাও হারিয়ে গেলো । পাগলের মতো খুঁজতে লাগলেন তার লাইন । শব্দের কপাল ! স্নান করে এসে দেখেন পরের লাইনটা কেউ এসে লিখে দিয়েছেন । দেহি পদপল্লব মুদারম। গীতগোবিন্দ সম্পূর্ণ হলো । ' আমাদের দেশে জয়দেবের মূর্তি নাই , কিন্তু জয়দেবের মেলা আছে '। রবি ঠাকুর লিখেছিলেন । জয়দেবের মেলায়  মানুষের মূর্তি, মানুষই রচনা করে যাচ্ছেন । হাজার হাজার মানুষ যে গীত রচনা করে যাচ্ছেন তাঁকে ঘিরেই।  তাতে আর  মূর্তির কি দরকার ? 

 মেলায় বসে খাওয়া দাওয়া 

অজয় নদী ছেড়ে এলাম মন্দিরে । জয়দেব লক্ষ্মণসেনের সভাকবি ছিলেন বলে মনে করা হয়। এই গ্রামে জয়দেব  প্রতিষ্ঠা রাধামাধবের মন্দির । মনে  মনে  ভাবি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে কবি জয়দেব , জয়দেব হয়ে উঠতে পারতেন কিনা সন্দেহ । সেই সময় সকলেই রাজার পায়ের তলায় বসে কবিতা লিখতেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কবি জয়দেব কখনো লক্ষনসেনের ফরমাসে গীতগোবিন্দ লেখেননি।  মন্দিরের সারা গায়ে টেরাকোটার কাজ। কাব্যের নায়ক-নায়িকা রাধা-কৃষ্ণ হলেও তাঁদের প্রতীকে জীবাত্মা-পরমাত্মার সম্পর্ক এবং নর-নারীর চিরন্তন প্রেমই এর মূল বক্তব্য।  বৈষ্ণব সম্প্রদায় ও সাহিত্য-রসিকদের কাছে গীতগোবিন্দম্ এক সময় পরম শ্রদ্ধার বিষয় ছিল। দেয়ালের ছবিতে আমি জয়দেবকে খুঁজে পাইনি । জয়দেব রয়েছেন মেলায়, বাউলের গানে , অজয়ের প্রকৃতিতে । আমি ভ্রমণ শেষ করে যাবো মামা ভাগ্নে পাহাড়ে ।


 সে সময় ছবি আমি তুলিনি । 

** ছবি আমার কাছে নেই সেই জন্য আমি ছবি গুলো নেট থেকে নিয়েছি ।

মন্তব্যসমূহ

  1. দাদা আপনার জনম সার্থক।

    উত্তরমুছুন
  2. লেখা পড়ে জয়দেব ঘুরে নিলাম।খুব ভালো লাগল পড়তে।

    উত্তরমুছুন
  3. ভীষন সুন্দর আপনার লিখনশৈলী।

    উত্তরমুছুন
  4. এতো সুন্দর কি লেখেন ।

    উত্তরমুছুন
  5. উত্তরগুলি
    1. বাহ সুন্দর লেখা ‌এই মেলার কথা অনেকেরই লেখা পড়েছি। তোমার লেখা টি ও ভালো লাগলো। ঝরঝরে স্বতঃস্ফূর্ত।

      মুছুন
  6. লেখাটি পড়ে খুব ভালো লাগলো। মনে হচ্ছে, এবারেও যদি জয়দেবের মেলায় ঘুরে আসতে পারি।

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মধেরার সূর্য মন্দির

মিশর ভ্রমণের নান্দীমুখ।

হালিশহর এক দিনের ভ্রমণ।