পুজো না দেখার ছবি
পুজো না দেখার ছবি
বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায়।
সহজ করে বলাটা বড় কঠিন। সহজ করে দেখা আর সহজ করে বলা অনেকটা পদ্ম পাতায় জলের মতো, সব সময় টলমল করে। সত্যি কথা বলতে কি সহজ করে কাউকে বলতে পারলাম না পুজো দেখার কথা। কেন না আমি কোনদিন কলকাতায় হেঁটে হেঁটে পুজো দেখিনি। (গাড়িতে চেপেও দেখিনি ) ভিড়ে আমার এলার্জি। আমার স্বপ্নে কখনো কলকাতার পুজো ছিল না। তাই বলে আমি বলছি না : গ্রামে পুজো দেখতে যাই। আমার কিছু বন্ধু-বান্ধব আছেন, শখের ফটোগ্রাফার। তারা পূজো আসার আগেই কাশফুলের ছবি তুলতে বেরিয়ে পড়েন। ছবিতে মেকি মেকি অপু দুর্গার ছবি তৈরি করেন। আবার তারাই (সখের চিত্রগ্রাহকরা) প্রাচীন দুর্গাপুজোর খোঁজখবর নিয়ে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। তারপর সাংবাদিকতার মেজাজে ভিডিও করতে শুরু করে দেন। আমি পুজোয় একটু বেড়াতে যেতে ভালোবাসি। বেড়াতে গিয়ে যদি ঢাকের শব্দ শুনি,তখন অদ্ভুত একটা আনন্দ লাগে । ভাবি পুজো মন্ডপে গিয়ে পাত পেরে বসে দুটি খাওয়া যায় কি না? আর ভাবি মালভূমি থেকে কবে একটা নদী কিনে আনবো।
আমার ভালো লাগার তালিকায় আছে শ্রাবণের বৃষ্টি, পাহাড়ে জোছনার রাত, আর ধোঁয়া ধোঁয়া দূরের নদী। সত্যি কথা বলতে কি পাহাড়ের বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগে এমন পাইনি কাউকে! তখনই মনে পড়ে কালো ছাতা কার আবিষ্কার ? একবার মায়াবী আলোয় দেখা হয়েছিল একটি ছায়ার সাথে। ভেবেছিলাম এই তো সে যাকে আমি নদী কিনে দেবো বলেছিলাম। সে বলেছিল সত্যিই নদী কেনা যায় নাকি? সহজ ভাবে বলেছিলাম হ্যাঁ আনবো তো তোমার জন্য। বুকের কাছে নদীর জল এসে লাগে। নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ হয়।
ঢাকের শব্দ থেকে বহুদূরে থেকেও, পুজোর সময় যেখানেই বেড়াতে যাই না কেন, আগমনীর ঢাকের সুর বুকের ভিতর বাজতে থাকে। মনে থাকে আজ অষ্টমী। বাড়িতে খিচুড়ি হবে। সারা বাড়িতে ঘি ঘি গন্ধ। অষ্টমীর দিন যেখানেই যাইনা কেন ঘি-এর গন্ধ খোঁজার চেষ্টা করি। অনেকটা মরুভূমিতে নদী খোঁজার মতো!
অষ্টমীর থেকে নবমী অনেক রোমান্টিক।আমি যেখানেই থাকি না কেন নবমীর দিন ব্যাগ থেকে একটা পাঞ্জাবি বের করে পড়ে ফেলি। আর সেটা যদি হলুদ পাঞ্জাবি হয় তবে তো কথাই নেই! ফুরফুরে বাতাসে খুঁজে পাই হারিয়ে যাওয়া তাকে,যার হাতে থাকতো একটা নীল রঙের ময়ূরের পালক।ছোটবেলা সে তো ফের আসে না,তবু তাকে দেখতে পাই আদিবাসী পাড়ায়।
আমি আর তন্ময় গিয়েছিলাম একবার ঘাটশিলায়।পলাশ তখন শেষ হয়ে গেছে । গ্রামে গ্রামে পদ্মফুল ফুটে গেছে । কাশ ফুলের মাথায় হাওয়ার দোলা । সন্ধ্যাের দিকে গলায় একটা মাফলার থাকলে ভালো হয়। যে ঢাকিরা ঢাক বাজাতো খালে বিলে , তারা উঠে এসেছে স্টেশন চত্বরে । বাতাসে সুন্দর একটা গন্ধ । গন্ধটা যে কিসের এখন আর মনে নেই। তবে সে গন্ধটা এখনও পাই পুজো আসার আগেই । আমার বয়স তখন কত ১৯ কিম্বা ২০ হবে । সেই তখন থেকেই গন্ধটাকে নিয়ে আমি ঘুরি ।
এসেছি সুবর্নরেখা নদী দেখতে। সকলে বলেন এই নদীতে সোনা পাওয়া যায়। সেখান থেকেই নামের উৎস। আসলে নদীর উৎস রাঁচির সেই পিস্কা গ্রাম থেকে। এই গ্রামের পাশেই ছিল সোনার খনি।বর্ষার জলে খনি ধুয়ে জল আসত। সেই জলেই থাকতো সোনা। আসলে আমার মনে হয় সুবর্ণরেখা নদীর বাঁকগুলো সরু তুলি দিয়ে সোনার পাতে মোড়া। যারা সুবর্ণরেখার উপর সূর্যাস্ত দেখেছেন আশা করি তারা সোনা খুঁজে পেয়েছিলেন। ঋত্বিক ঘটকের সুবর্ণ রেখা সিনেমাটি দেখার পর থেকে এই নদীটি দেখার একটা প্রবল বুকের ভেতর জমেছিল। সেই সিনেমায় বিখ্যাত একটা লাইন ছিল 'মায়ের মত পালিয়ে যাবি নাতো দিদি?' মাতৃরূপটি ছবিতে আদিমাতার এক রূপকল্প হয়ে ফিরে আসে বার বার। একদম সুবর্ণরেখা নদীর মত। যেটা ছিল দেশভাগের কথা। আর এখানে সুবর্ণরেখা পাহাড়ের বাঁকে হারিয়ে
সারাদিন সুবর্ণরেখার ধারে ধারে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত । দুপুর বেলা এমন একটা জায়গায় এসেছি খাবার হোটেল বহু দূর । কপার ফ্যাক্টরি পাশ দিয়ে যেতে মনে হলো এখানকার ক্যান্টিনে আমরা খেতে পারি কম পয়সায় । সেখানেও কপালে বিধি বাম । কুপন ছাড়া খাবার দেওয়া হয় না । আর কুপন স্টাফ ছাড়া কাউকে খাবার দেওয়া হয় না । স্টাফ কোয়াটারের পাশ দিয়ে যেতে একটি গেটে দেখলাম লেখা আছে একজন বাঙালির নাম । সোজা গেট খুলে তার কাছে আমরা হাজির । আমাদের সব কথা শুনে বল্লেন আজ মহা সপ্তমী । ক্যান্টিনে অনেক কিছু রান্নাও হয়েছে । আমি বাড়িতে খাবো l তোমাদের কুপন দরকার তো এই নাও । যাও খেয়ে এসো । ক্যান্টিনে গিয়ে মনে হল গুপী বাঘা ফিরে এলো মন্ডা মিঠাই নিয়ে।
প্রতিবছর পূজো আসে আবার ফিরে চলে যায় আর একটা পুজোর জন্য। এত বছর ধরে তাকে আমি মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে আসছি, নদী কিনে দেবো। কিন্তু দিতে পারলাম কই? প্রতিটি শরদে তাকে মিথ্যে কথা বলি। আর নয়, এবার জ্যোৎস্না মাখা নদী কিনে দিয়ে আসবো জঙ্গিপুরের মৈত্রীকে ।


.jpeg)
.jpeg)

এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।
উত্তরমুছুনখুব ভালো লাগলো অনেক ভালো থাকবেন
মুছুনসবাই এখানে মন্তব্য করুন
উত্তরমুছুনShuvo Sarodia..Ashadharon lekha..Mon vore galo.
মুছুনঅনেক অনেক শুভেচ্ছা নেবেন
মুছুনঅসাধারণ লেখেন আপনি।
উত্তরমুছুনঅনেক শুভেচ্ছা নেবেন
মুছুনলেখার সাবলীল বহমানতা লেখার সৌন্দর্য বাড়িয়েছে।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ আপনাকে
মুছুনঅপূর্ব লাগল |
উত্তরমুছুনভালো থাকবেন। অনেক ধন্যবাদ
মুছুনMonta bhalo hoye gelo
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক শুভেচ্ছা
মুছুনশুভ শারদীয়ার শুভেচ্ছা জানাই । লেখা টি অসাধারণ । আরও লেখা পড়তে চাই ।
উত্তরমুছুনআমি অবশ্যই লিখবো
মুছুনDarun sunder lekha
উত্তরমুছুনThanks
মুছুনবুকের মধ্যে তিরতির করে নদী বয়ে যাচ্ছে।খুউব সুন্দর লেখা।
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক ধন্যবাদ
মুছুনKhub sundar!
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক ধন্যবাদ
মুছুনKi opurbo apnar bornona..chobir moto dekhte pelam
উত্তরমুছুনThanks
মুছুনBhalo lekha, likhte likhte aro bhalo. hobe likhe. Jan.
উত্তরমুছুনBh
অনেক ধন্যবাদ
মুছুনNice
উত্তরমুছুনThanks
মুছুনNicely explained.
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে
মুছুনঅসাধারণ লেখনী শক্তি এবং তার সাথে যোগ দিয়েছে আপনার বর্নময় বর্ণনা 👏👏👏👌👌
উত্তরমুছুনশারদীয়া শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন
মুছুনNice
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক ধন্যবাদ
মুছুনDada ki kore eto bhlo lekhen. Darun laglo
উত্তরমুছুননিজের মতো করে লিখি। ভালো-মন্দ জানিনা।
মুছুনVery nice picture and writing
উত্তরমুছুনমহা ষষ্ঠীর শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন।
মুছুনKhub sundor.... sahoj sarol vasai lekha ❤️❤️... Nodi pelen to..take deben obossoi 🙂
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক শুভেচ্ছা গ্রহন করবেন
মুছুনএই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।
উত্তরমুছুনAsadharon chobi ebong lekhar jonno dhonnobad apni bhalo thakben.
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক শুভেচ্ছা, আপনিও ভালো থাকবেন
মুছুনলেখাটার মধ্যে একটা পুজো পুজো গন্ধ ছাড়াও সুন্দর একটা মাটির গন্ধ আছে।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ
মুছুনKhub valo
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক ধন্যবাদ
মুছুনNice
উত্তরমুছুনThanks
মুছুন