গ্রাম দর্শন

গ্রাম দর্শনের নান্দীমুখ 

বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায় 

ভাবি একটা আস্ত গ্রাম লিখে  ফেলবো। কিন্ত আমি তো অবন ঠাকুর নই,যে শব্দ দিয়ে এঁকে দেবো একটা গ্রাম। বা কোন বড় চিত্র শিল্পী নই,তুলি দিয়ে ক্যানভাসে রং লাগিয়ে দেবো। কত দিনের ইচ্ছেকে বুকে নিয়ে ফ্রেম করেছি। কিন্ত লেখা আর হয়নি। হয়নি বলবো না লিখতে পারনি। সবুজ একটা দ্বীপান্তরের মতো মাঠ। লিকলিকে ঝাউ গাছের পাতা থেকে শব্দ আসে। সেই শব্দরা গান বানায়, বাঁশির সুর তোলে। হারিয়ে যাওয়ার আগে আরো একবার হারিয়ে যাওয়া। পরানে বাতাস লাগে। এই কত কিছু  দুচোখ ভরে দেখেছি। লিখতে পারলাম কই?পুজোর আগে সকলেরই যেন একটাই ইচ্ছে গ্রামে যাব। নিজের মতো করে স্বপ্ন নিয়ে আঁকিবুকি কাটবো। কচিকাচারের শব্দে ভরে উঠবে গ্রাম। আজানের আগেই মোরগ উঠবে ডেকে।


আমার এক মা আছেন তিনি জঙ্গিপুরে থাকেন। তার বাড়িতে বেশ ঘটা করে পুজো হয়। আমায় অনেকবার বলেছিলেন : বড় ছেলে তুই চলে আয়। তার ছেলে মেয়ে দুটিই বড় সুন্দর। তাদের সাথে কাটাতে পারলে ভালোলাগে । সেটাও করতে পেলাম কই! বাড়িটা পুরোনো রাজবাড়ি রাজ বাড়ি গন্ধ। সেখানে কত আম বাগান। বিশাল ছায়ার ফাঁকে পরে থাকা শুকনো পাতার উপর শুয়ে থাকা  কুকুরগুলো লেজ নাড়িয়ে আমায় গায়ের গন্ধ খোঁজে । নদী খুঁজতে খুঁজতে আমরা হারিয়ে ফেলেছি সময়। গণগনে দুপুর থেকে গণগনে চাঁদ দেখেছি। সন্ধ্যেবেলা মাঠের মাঝে যাত্রাপালা। খালি গা ছোট ছেলেমেয়েদের দল মাটির উপর এসে বসে পড়ছে। ওরা কিছু বুঝুক না বুঝুক সীতার পাঠ যে একটি ছেলে করছে, সেটা ওরা বুঝতে পারে। আর সীতা যখন আসে বারবার হেসে ওঠে বাচ্চাদের দল।এসব কিছু  দেখেছি। মনে হয় আবার চলে যাই।পুজোর সময় জামা কাপড় গুছিয়ে নিয়েও যাই নি। কেন যায়নি তার উত্তর আমি জানি না। ঠিক এই ভাবে আমি পুজোর সময় গ্রাম দেখা থেকে বঞ্চিত হয়েছি উত্তরবঙ্গে।

 সে বড় কঠিন সময় ছিল। চা বাগানের মাঝে বাড়ি ছিল শ্যামলীর। সকালে ঘুম ভেঙে দেখি সোজা রাস্তার ফাঁক দিয়ে সাইকেল চলেছে। দুপাশে চা বাগান। মনে হয় যেন দুটি সমান্তরাল সরলরেখা চা বাগানে মিশে গেছে। অল্প অল্প কুয়াশা। কুয়াশা তো নয়! ওরা আমার মেঘেদের বাড়িঘর! এদের নিয়ে আমি স্বপ্ন দেখতাম। উত্তরবঙ্গে  পুকুর নেই,নদী আছে। নদীর এই জলে শ্যামলী কতবার বলেছে যা স্নান করে আয়। নদীর পাড়ে কোন সারা শব্দ নেই। স্থানীয় এক রমনী কয়েক মাসের শিশুকে বুকে নিয়ে চলে এসেছে নদীর ঘাটে। আমাকে দেখে লজ্জা পেয়ে  মাথার ঘোমটা টানতে গিয়ে  বেচারির বুকের লজ্জা হল উদাস। নদীর ঘাটের কাছে গিয়েও ফিরে এসেছি।

পুজোর সপ্তমীদিনে শ্যামলীর জন্মদিন। জন্মদিনে প্রতিবারই আমার নিমন্তন্ন থাকতো। আমার জন্য সে পায়েস রান্না করে রাখতো। সারা দিন উপোষ। আমি না গেলে সে খাবে না। পাঁচ বছর পর পর কথা দিয়েছি যাবোই। উপহার কিনেছি। যাবার দিন যাওয়া হয় না। আমি দেখতে পাই সে কাঁদছে। আমি বুঝি তার কষ্ট, তবু যাওয়া হয় না। ট্রেন চলে যায় নৈহাটির উপর দিয়ে।  বেকার বয়সে বেড়াতে গিয়ে ফেরার সময় শ্যামলীর কাছে কতবার হাত পেতেছি। সে কিন্তু কোন দিন আমায় নিরাশ করিনি। শুনেছি আলিপুরদুয়ারে শ্যামলীদের চা বাগানের মাঠে একটা সুন্দর পুজো হয়। যাত্রাপালা হয়। কাঠের উপর কাঠের ঘর্ষনে যে শব্দ হয় নাগরদোলাতে তা  আমি চোখ বন্ধ করলে শুনতে পাই।


শ্যামলী এখন কোথায় থাকেন আমি জানিনা। রাগে, ঘৃনায় সে আমায় বিয়েতে যেতে বলেনি। আমার আর তার জন্য কোনদিনই সেই চা বাগনের পুজো দেখা হয়নি ।

মালবিকা একবার কলেজে বলে ছিল, পুজোর সময়  আমার সাথে যাবি সুন্দরবন? আমার মাসি থাকে গোসাবায় । বুকের ভেতরে ঢেউ  খেলেছিল । কিন্তু সে ঢেউ পাড়ে এসে পড়েনি । মালবিকার সাথে  কোন সম্পর্ক নেই , সে এলে কোথাও একটা কী হয় । মেয়েটি সামনে এলে কত রকমের ইচ্ছাপূরণের ছবি, মরীচিকার মতো অপ্রাপণীয়  চরিতার্থতার স্বপ্ন । গোসাবা বললেই  চোখের সামনে ভেসে ওঠে  হ্যামিল্টনের বাংলো,  রবীন্দ্রনাথের বাড়ি, নদীর পাড়ে বাঁধ। অনেক বাজার দোকান। নদীর ঘাটের কাছে নৌকা বাঁধা আছে এই নৌকা থেকে  অনবরত নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রিক উঠানামা করছে। মালবিকার মাসির বাড়ি গোসাবা থেকে ভ্যান রিক্সায় যেতে হয়। আমি বলেছিলাম : চল না ওখান থেকে চলে যাই পাখিরালয়।


ছোট ছোট মিষ্টি জলের ডোবা। সেই ডোবায় ছোট ছোট হাঁস চরছে চই চই। কাছে গেলেই মাটির দাওয়াতে উঠে পড়ে। পাশে রান্না ঘরের উনুন থেকে ধোঁয়া উঠছে। ফ্যান পোড়ার গন্ধ আসে। মনে পরে নদীর বাঁধ থেকে নেমে, ভাটার জলে কুচ চিংড়ি মাছ ধরা। মেয়েরা আপন মনে কাঁকড়ার খোঁজে হেঁটে চলেছে বিদ্যাধরী নদীতে। 


 পুজোর আগে কলেজ পাড়ায় বই কিনতে গিয়ে মালবিকা সাথে দেখা হয়ে যায় । সে কলেজে পড়াচে । দেখতে সেরকমই আছে, তবে গায়ে একটু মেদ বেড়েছে । তাতে আরো গভীরতা বেড়েছে , বেড়েছে ব্যক্তিত্ব । পেছন থেকে আলতো টোকা মেরে বলে : দাড়ি গুলো কাটিস নি কেন ?  ভূতের মতো লাগছে । চল আমার সাথে । মালবিকা কী আমায় সুন্দরবন নিয়ে যাবে ? সেই নৌকা,সেই গোসাবা? মাসি কী এখন আছে ?  অনেকক্ষণ কথা হলো।  কিন্তু কী কথা হলো কিছুই মনে নেই। শুধু মনে আছে বলেছিলো আমি পুজোয় গ্রামের বাড়ি যাবো।

তখন আমি ক্লাস সেভেন কিংবা এইটে পড়ি। একা একা যেতে হয়েছিল মেদিনীপুরের ঠাকুরচক বা খাকুরদা গ্রামে। বাস থেকে নেমে হেঁটে যেতে হবে। বাসস্ট্যান্ড থেকে  তিন চার কিলোমিটার রাস্তা। আলপথ হৈমন্তীক ধানের ক্ষেত । তখনও আমি ধানগাছ বলি। আমি যত গ্রাম দেখি  মনে হয় মায়ের শৈশব। সেই জীর্ণ সেতু। আমার অভিমান। ধানক্ষেত বলি না। মাঠে যাতে গরু, ছাগল না যেতে পারে বেড়া দেয়া হয়েছে বাবলা গাছ কেটে। বর্ষার পরসেই কাঁটা ছড়িয়ে পড়েছে পথে।সেটাই আমার জীবনে সবচেয়ে কঠিনতম গ্রাম দেখা। কাদায় পা ঢুকে যাচ্ছে  আর তার সাথে ফুটে যাচ্ছে বাবলাকাটা। আমার থেকেও বেশি কষ্টমনে হচ্ছে গরুগুলোর। কাদায় পা ঢুকে যাচ্ছে গাড়ির চাকা ঢুকে যাচ্ছে। তবু তাকে চলতে হচ্ছে। কি ভাবে চোখ মেলে তাকাবো। সেই সঙ্গে শুরু হলো অঝোরে বৃষ্টি। সারা শরীর জুড়ে  কাদা। মনে হচ্ছে আমি যেন কুমারটুলি থেকে উঠে এসেছি। মাসির বাড়ি যখন পৌঁছলাম। দুটি পায়ে রক্ত-কাদায় বিষাক্ত। মাসি আমার পায়ে লাগিয়ে দিয়েছিলো কি একটা পাতার রস। 


তিন দিন দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা ছিল না। মাটির দোতলা বাড়ি থেকে একটা অদ্ভুত গন্ধ পাই। সেই গন্ধটা যে কেমন তা আমি অনুভব করতে পারি কিন্তু প্রকাশ করতে পারি না। জানালার ফাঁক দিয়ে শুধু দেখতাম কতগুলো তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে। শন শন করে হাওয়া বইত। শুয়ে শুয়ে ভাবতাম কবে বাড়ি যাবো। আকাশে পঞ্চমী। ঢাকিরা সেরে নিচ্ছে তাদের প্রস্তুতি। দূর ভেসে আসছে  ঢাকের শব্দ। 


মন্তব্যসমূহ

  1. কিই যে বলি ! এ জীবনে গ্রামে যাওয়ার স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। আপনার চোখে এক ঝলক দেখে নিলাম।

    উত্তরমুছুন
  2. ভীষণ ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  3. উত্তরগুলি
    1. আপনি আমার শুভেচ্ছা গ্রহন করবেনআপনি আমার শুভেচ্ছা গ্রহন করবেন

      মুছুন
  4. দারুন দারুন অতুলনীয়

    উত্তরমুছুন
  5. (Santa kundu) - Kato kichhuito anubhab kori kintu prokash korte pari koi. Apnar asadharon chhobir moto prokash kkhamota bar bar mughdho korey. 😊👌

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. কি বলে ধন্যবাদ জানাবো বুঝতে পারছি না। আপনি আমার সব লেখা পড়েন। এর জন্য আপনার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

      মুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মধেরার সূর্য মন্দির

মিশর ভ্রমণের নান্দীমুখ।

হালিশহর এক দিনের ভ্রমণ।