শুশুনিয়া
ক্রমশ মিলায় দূরে শুশুনিয়া
বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায় ।
দিক নির্ণয় করতে বড় ভুল হয়ে যায়। পুরনো কথা বলতে বলতে, দিক নির্ণয় আর হয় না। ভ্রমণ করার পাগলামির কথাগুলো যখন মনে পড়ে, ভাবি কত কান্ড না করেছি! শুধু শুশুনিয়া যাব বলে, শঙ্খ ঘোষের কবিতা ক্রমশ মিলায় দূরে শুশুনিয়া কতবার যে পড়েছি তার ঠিক নেই। এখনো সে কবিতা মুখস্ত বলতে পারি। ভ্রমণের খাতায় আবার উঠে এলো সেই শুশুনিয়া পাহাড়।
![]() |
| শুশুনিয়া পাহাড় |
সে আমায় বল্ল আমরা এবার শুশুনিয়া যাব । আমি বললাম কে কে যাবি? তুই আর আমি । শেষ পর্যন্ত স্কুলের আরেক বন্ধু দেবাশিস রায় ( এখন সংবাদিক)।বলা হলো সেও রাজি হয়ে গেলো । সবে আমাদের দাড়ি গজিয়েছে । তবে দেবাশীষের এক মুখ দাঁড়ি ছিল । যা এখনো আছে । ঠিক হলো যাবো । কিন্তু থাকবো কোথায়? আমাদের বাড়িতে একটা ভদ্রমহিলা থাকতেন । তার বাড়ি ছিল বাঁকুড়া বেলিয়াতোড় । ঠিক হলো প্রথম রাত সেখানে কাটাবো । কাটানোর একটা কারণও ছিল এই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যামিনী রায়ের মতো শিল্পী । তার বাড়িটাও যদি দেখা যায় । আমরা বর্ধমান থেকে বাসে করে দুবার বাস পাল্টানোর পর গেলাম বেলিয়াতোড়। যে বাড়িতে গেলাম মাটির বাড়ি।তাও কিছুটা ভেঙে গেছে ।খুব কষ্টের সংসার । তার মধ্যেই আমরা নিজেদের মতো করে থেকে গেলাম।রাতে কুড়নো পাতা জ্বালিয়ে রান্না হলো, গরম ভাত আর একটা আলুর তরকারি । সে কী অসাধারণ হয়েছিল আজ ও তা আমার মনে আছে ।
পরের দিন আমরা বাস ধরে গেলাম ছাতনা বাস স্ট্যান্ড। সেখান থেকে ছোট গাড়ি করে পাহাড়ের পাদদেশে । পুজোর সময় একটু একটু ঠান্ডা পরতে শুরু করেছে । দু দিন স্নান নেই। শুশুনিয়া পাহাড়ের কোলে একটা সরু জলের ধারা নেমে এসেছে ,সেখানেই আমরা স্নান করে নিলাম । এই জলের অনেক গল্প শুনলাম । নানা রোগ নাকি সরিয়ে তুলতে পারে এই জল । আমি ভাবি আমার এই বেড়ানোর রোগ কী সরিয়ে তুলতে পারবে এই জল ।তাঁর মতো করেই বলতে হয় : জল কী তোমার কোন ব্যথা বোঝে?
![]() |
| প্রমস মিলায় দূরে |
পাহাড়টি দেখছি আর কবিতার সাথে মিলাচ্ছি । আমাদের কাছে ক্রমশ সামনে চলে আসছে শুশুনিয়া পাহাড় । কেমন একটা ধোঁয়া ধোঁয়া ভাব সারা পাহাড় জুড়ে । শুনেছি এই পাহাড় নাকি হিমালয়ের থেকেও পুরনো । সুদৃশ্য সবুজ এবং লাল মাটির দর্শনীয় প্রাকৃতিক দৃশ্যের মাঝে, শুশুনিয়া পাহাড় প্রায় ১২০০ ফুট উচ্চতার মালিক। পাহাড়টি তার দুর্দান্ত প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের জন্য একটি জনপ্রিয় জায়গা। শুশুনিয়া পাহাড়টিও ঐতিহাসিক মূল্যবান সমৃদ্ধ। ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, রাজা চন্দ্রবর্মণ এই স্থানে তাঁর দুর্গটি তৈরি করেছিলেন তবে বর্তমানে এই দুর্গের কোনও চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর শিলালিপিগুলি অনুসারে এই স্থানের নাম পুষ্করণ রাখা হয়েছিল। পুষ্করণ বা পখন্না চন্দ্রবর্মণের রাজ্যের রাজধানী ছিল। এখানে একটি শিলালিপি আছে যা পশ্চিমবঙ্গের ‘প্রাচীনতম’ শিলালিপি হিসাবে বিবেচিত। পাহাড়টি দুর্দান্ত প্রত্নতাত্ত্বিক মান বহন করছে পাশাপাশি জিরাফ, এশিয়াটিক সিংহ, হায়েনা এবং আরও বিভিন্ন প্রজাতির প্রাচীন জীবাশ্মের পাওয়া গেছে এই পাহাড় থেকে। সেই সময় ১২০০ ফুট পাহাড়ে চড়া আমাদের কাছে কিছুই না । যখন ফিরে আসছি সূর্য তখন ডুবে নি অথচ আকাশের লাল ছটায় যেন রোদের উজ্জ্বলতা। গাঢ় তামাটে রঙে একটু রক্তিম । শাল পিয়ালের মাথার উপরে আকাশ লাল । আকাশের লাল ছটায় আরো লাল দেখাচ্ছে শুশুনিয়ার মাথা ।
![]() |
| এই ভাবেই চেয়ে থাকা |
আমার মাথায় কবিতা নয় ঘুরেছে দশ অবতার তাসের কথা । বাঁকুড়ার পটুয়াপাড়া, রামকিঙ্কর বেইজ,বাঁকুড়ার বিখ্যাত বালুচরি শাড়ি , বিষ্ণুপুর ঘরানার গান সব ভুলে গেছি । বিষ্ণুপুর ঘরানা হল ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের হিন্দুস্তানি ধারার দ্রুপদ সংগীতের একটি ঘরানা।১৮শ শতাব্দীতে এই ঘরানা বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। আমার মাথায় ছিল এগুলো । কী করে এসব দেখবো? আমাদের কাছে এসব দেখার খুব একটা আগ্রহ নেই। আমাদের চিন্তা মুকুট মণিপুর যাবার। অনেক টা যেতে হবে । লক্ষ্মী পুজো আসছে । আকাশের চাঁদ রাত হলে বড়ো হবে । তাই চল মুকুটমণিপুর যাই । এখানকার সৌন্দর্য অসাধারণ । একদিকে কংসাবতীর বিশাল ড্যাম আর অন্যদিকে পাহাড় আর ছোট ছোট গ্রাম ।ওখানে বাঁধের মাথায় চাঁদ উঠবে আমরা সেটাই দেখবো।সোনাঝুরি থেকে ড্যাম হেঁটে মিনিট পনেরো লাগে । ড্যামের পাঁচিলের ওপর দিয়ে রাস্তা চলে গেছে । আমরা এই রাস্তা ধরে কিছুদূর হেঁটে গেলাম । মুকুটমণিপুরে দুএকটা হোটেল খোজা হলো কিন্তু যে ভাড়া ওরা চাইছে তা আমাদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয় । অতএব রাত কাটিয়ে দেবো বাঁধের সাথে । সেই ভাবে ঠিক করেছি বাঁধেই শুয়ে পরবো । পেটে একটু সুরা পড়লে ভালোই হতো । সে আর কপালে কোন দিন জুটল না । তখন কথায় কথায় মানুষ মানুষকে উগ্র পন্থী বা মাওবাদী ভাবতো না । বাঁধে শুয়ে আছি রাতে হঠাত্ পুলিশ এসে হাজির। পুলিশ আমাদের বাঁধে শুতে দেবে না। ওরা আমাদের গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যাবে। আমার ও যাবো না । আমরা পুলিশ কে বোঝাবার চেস্টা করলাম আমাদের কাছে হোটেলে থাকার পয়সা নেই।এখানে একটা ইয়ুথ হস্টেল আছে সেখানে জায়গা নেই ,আমরা কোথায় থাকবো বলুন । আপনারা একটা থাকার ব্যবস্থা করে দিন । আমরা বললাম গ্রেপ্তার নয় ,আপনারা আমাদের থানায় নিয়ে চলুন সেখানেই থাকবো । পুলিশ যদি নিয়ে যায় ভালই হয় । শীত লাগছে আর বাঁধে থাকা যাবে না । শেষ পর্যন্ত পুলিশ আমাদের তুলে নিয়ে গিয়ে একটা স্কুল বাড়িতে রেখে দিলো ।
![]() |
| গ্রামের বাড়ি |
ঘন গাছ পালা ,চারিপাশে শাল, তমাল, শিমুল, নিবিড় সবুজ আর নীল । তার ফাঁকে ফাঁকে,রক্তিম তির্যক রেখা কংসাবতীর হালকা গেরুয়া বালুচরে । সূর্য উঠছে গাছপালার আড়ালে । সূর্য উঠছে দ্রুত , যেন দুরন্ত বেগে পাক খেতে খেতে । বিধ্বস্ত শরীর । সেরকম ভাল-মন্দ খাবার ও পেটে নেই কয়েকদিন । শরীর সেভাবে আর টানছে না । বাড়ি ফেরার তাগিদ অনুভব করি । পরের দিন সকাল বেলা আমরা খাতরা বাসস্ট্যান্ডে এসে পৌঁছলাম । বাসস্ট্যান্ডে এসে আমরা লুচি তরকারি খেলাম । হঠাৎ দেখি দেবাশীষকে দেখা যাচ্ছে না । এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতে দেখি সে একটা দোকানে বসে এক গ্লাস দুধ আর জিলিপি নিয়ে বসে খাচ্ছে । তারা আগে কি খেয়েছে আমরা জানি না । তাকে বিল মেটাতে হলো ৩০ টাকা । কি করলি দেবাশীষ তুই ৩০ টাকা খরচা করে ফেললি । আমরা বাড়ি যাব কি করে ? এখন সব মিলিয়ে আমাদের তিনজনের কাছে আছে মাত্র ২০ টাকা । কি ভাবে আমরা বর্ধমান পর্যন্ত যাব ? বাসের চালক কে সব কথা জানানো হলো তিনি কোন ভাবেই রাজী হল না আমাদের নিয়ে যেতে । শেষ পর্যন্ত বাসের কন্ডাক্টরকে আমরা ধরে বললাম, বাসের মাথায় তো ছোট ছোট ছাগলছানা ও যাচ্ছে আমরা ছাদে চলে যাব আপনাকে মাত্র ২০ টাকা দিতে পারব । সে কি বুঝলো জানিনা আমাদের বাসের মাথায় তুলে দিল ।
![]() |
| এরকমই একটি বাসে করে ফেরা |
কারুর কাছে কোন কানাকড়িও নেই । বর্ধমানের নেবে বাড়ি যাবই বা কি করে ? আর খাবিই বা কি ? আমার এক বন্ধু ছিল কবি রাজকুমার রায়চৌধুরী । তার বন্ধু ছিল শিল্পী শ্যামল সাহা । তার বাড়ি বর্ধমান
কাললা রোডে। খুঁজে খুঁজে তার বাড়িতে গিয়ে আমরা পৌঁছালাম । গিয়ে দেখি বাড়িতে সানাই বাজছে নহবৎখানা বসেছে । এ কোথায় এলাম ? একজনকে জিজ্ঞেস করলাম এটা কি শ্যামল বরণ সাহার বাড়ি ? তিনি বললেন হ্যাঁ আজ তার বোনের বিয়ে । আনন্দে লাফিয়ে উঠি । শ্যামল বরণ আমাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা করে তার ঘরে নিয়ে গেল দিদির সাথে পরিচয় করে দিল । আমার কাছে ছিল সে একটাই বই শঙ্খ ঘোষের কবিতাসংগ্রহ । সেটা দিদি হাতে আমরা তুলে দিলাম। ভোজ বাড়িতে সেকি খাওয়া চিংড়ি থেকে পাঁঠার মাংস সবকিছুই রয়েছে মেনুতে । তিনজনে চেটেপুটে খাবার পর শ্যামল বরণ কে বললাম আমাদের কিছু টাকা দাও ট্রেনের টিকিট কেটে বাড়ি ফিরব। শ্যামল বরণ সঙ্গে সঙ্গে আমাদের হাতে গুঁজে দিল ৫০ টাকা আমরাও এক দৌড়ে চলে এলাম বর্ধমান স্টেশনে ।





মনোগ্রাহী ❤️
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক শুভেচ্ছা
মুছুনAshadharan lekha
উত্তরমুছুনধন্যবাদ
মুছুনখুব ভালো ।
উত্তরমুছুনআপনি আমার শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন
মুছুনঅসাধারণ লেখা।
উত্তরমুছুনভালো থেকো
মুছুনতোমার লেখা সব পেয়েছির দেশে নিয়ে যায়, দীর্ঘ ক্লান্তিকর পথের বাঁকে একটুঝলক খোলা হাওয়া যা শুধুই শান্তি দেয়
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক শুভেচ্ছা ভালো থাকবেন
মুছুনTomar lekha ebong chobi amake sei jagae niye jay ar bhromon er ek matro manush hisebe tumi amar kache adorsho.Bhalo theko
উত্তরমুছুনখুব সুন্দর বলেছ। অনেক অনেক শুভেচ্ছা গ্রহন করো
মুছুনখুব সুন্দর লিখেছেন।
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক শুভেচ্ছা
মুছুনঅসাধারণ এটা বলে দিলে তো হয়েই গেল/ ভ্রমণ পিপাসুদের প্রতি শুভেচ্ছা রয়ে গেল।
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক ধন্যবাদ
মুছুনলেখাটি পড়ে খুব ভালো লাগলো। মনেহচ্ছে যদি যেতে পারতাম!
উত্তরমুছুনআপনি যে আমার লেখা পড়েন, তার জন্য অনেক অনেক শুভেচ্ছা।
মুছুনSo beautiful Bama kaku.
উত্তরমুছুনধন্যবাদ
মুছুনআপনার পথিক সুলভ মনটার জন্যই ত ,আপনি আমাদের প্রিয় বামাদা ।আপনার লেখার সাথেই মন টাকে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়াই।
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক ধন্যবাদ
মুছুনপ্রানজলতাময় একটি লেখা।কত অবলীলায় আপন জীবনের অভিজ্ঞতা ব্যকত করা। খুব ভালো লাগলো।
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক ধন্যবাদ
মুছুনVery nice
উত্তরমুছুনThanks
মুছুনNicely written
উত্তরমুছুনধন্যবাদ
মুছুনKhub bhlo
উত্তরমুছুনঅনেক শুভেচ্ছা
মুছুনdarun
উত্তরমুছুনধন্যবাদ
মুছুনসুন্দর লিখেছেন
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক শুভেচ্ছা নেবেন
মুছুনঅসাধারণ।
উত্তরমুছুনঅশেষ ধন্যবাদ জানাই আপনাকে।
মুছুনNice
উত্তরমুছুনধন্যবাদ
মুছুন