ঘোড়াখুর জলপ্রপাত

 ঘোড়াখুর জলপ্রপাত 

বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায় ॥

একোন দেশে এলাম? কিছুই বুঝতে পারছি না। পুরো পাহাড়ের  গর্তের মধ্যে যেন আমি ঢুকে পড়েছি । গোল করে ঘিরে রেখেছে পাহাড় । যে দিকেই আমি এগিয়ে চলি সেদিকেই পাহাড়  পিছিয়ে চলে। এ যেন বুড়ি ছোঁয়ায় এক লুকোচুরি খেলা! সামনে এগিয়ে গেলে পেছন দিক এগিয়ে আসে। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হেটে চলেছি।  মানুষ জন নেই বললেই চলে। মাঝে মাঝে দু একজনকে দেখা যাচ্ছে মাথায় কাঠের বোঝা নিয়ে জঙ্গল থেকে ফিরছেন। তাদরে হাতে মোটা বাশের লাঠি। কিছুটা যাবার পর দেখি কয়েকটা গরু হুড়মুড় করে পাহাড় থেকে নেমে আসছে। আমি একটি পাহাড়ীরা ধারায় কোন রকমে নেমে পড়ে নিজেকে আশ্বস্ত করি।  

ঘোড়াখুর জলপ্রপাত

একটু আগে আমি দেখে এসেছি হাহা পঞ্চ কুমারী পাহাড় , উল্কাপাতের পর সৃষ্টি হয়েছিল লেকটি । লেকের নাম খড়গ পুর লেক বা খড়গপুর ঝিল। খড়গপুর মোড় থেকে আমরা আরো এগিয়ে এসেছি। লেক থেকে বেড়িয়ে আরো পাঁচ কিলোমিটার দূরে ধাপরি মোড়। ভাগলপুর মুংগের রাস্তায় যে রাস্তাটা চলে গেছে জামুয়ের দিকে সেই রাস্তায়। ধাপরি মোড় থেকে আমাদের গাড়ি ঘুরে গেল একটা গ্রামের ভেতর। দেখলেই বোঝা যায় গ্রামটিতে জনজাতি মানুষের বাস। মাটির বাড়ি । শক্তি চট্টোপাধ্যায় থাকলে আবার বলতেন দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া । বাড়িতে বাড়িতে সিম গাছ উঠেচে লতিয়ে। কৃষিপ্রধান গ্রাম নয় । রুক্ষ লালমাটির আবরণে ঢেকে আছে গ্রাম । কৃষি না থাকলেও পশুপালনই  মানুষের জীবন জীবিকা । এখানে এসে শুনলাম  একসময় নাকি নকশালদের প্রভাব ছিল এই অঞ্চলগুলিতে । দেখতে এসেছি ঘোড়াখুর জলপ্রপাত। যে জলপ্রপাতের নাম দেশের নয়, বিহারের বসবাসকারি মানুষদের মধ্যে পয়েন্ট  শতাংশ মানুষ জানেন না । বলা যেতে পারে আমরাই মনে কয়েকজন এই জলপ্রপাতের  নিজস্বতাকে, নির্জনতাকে ভেঙে দিলাম। 

জলপ্রপাত থেকে  নেমে আসা জল 

আমাদের গাড়ি টালমাটাল করতে করতে এসে থামলো একটা পাহাড়ের চাতালে। সেখান থেকেই কোন দিক দিয়ে আমরা জলপ্রপাত দেখতে যাব তা নিজেরাই জানি না। সামনে জঙ্গল আল পথ। অসল দূপুরে ডাংগুলি খেলা চলছে। তিনটি বালক দৌড়ে গেল রৌদ্র ভরা উত্তরণে । এই মাঠের মাঝ দিয়ে আলপথ ধরে  আমাদের হেটে যেতে হবে ঘোড়াখুর জলপ্রপাতের কাছে ।  

ভাবি একোন দেশে এসে পরলাম! প্রাণে ভয় লাগে কেন? ভয় লাগে একটি কারণে যা দেখতে এসেছি তা দেখতে পাবো তো? জলা জঙ্গলের পথের দু পাশে বন তুলসী ফুল, বুনো বুনো গন্ধ। হেঁটে চলেছি । অনেকটা পথ হাঁটা হয়ে গেল । মাঝে একটা ছোট্ট জলধারাকে অতিক্রম করেছি । জলধারা অতিক্রম করার পর একটি মানুষের সাথে দেখা হল । জঙ্গলে কাঠ সংগ্রহ করছিলেন তিনি । তাকে জলপ্রপাতের কথা বলাতে তিনি হাত উঁচু করে দেখালেন ওইদিকে । আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি একটা মন্দিরের চূড়া দেখা যাচ্ছে । বুঝতে পারি ওখানেই আছে আমাদের আকাঙ্ক্ষিত জলপ্রপাতটি ।

জঙ্গলের পথে 

শব্দকে স্তব্ধ করে কে ? কান পাতলে শব্দ শোনা যায় ।জঙ্গলের মধ্যে  জলপ্রপাতের শব্দকে ছন্দময় মনে হয় । এই শব্দ ছড়ার ছন্দে নয় । নিটোল মাত্রাবৃত্তের সুর। এগিয়ে চলো , এগিয়ে চলি । মন্দিরের মুখোমুখি এসে দাঁড়াই । মন্দিরের পাশ দিয়ে বাঁদিক দিয়ে নেমে গেলেই চোখে পরে দুধ সাদা জলরাশি।এটাই ঘোড়াখুর জলপ্রপাত। অবাক প্রানে তাকিয়ে থাকি। নানা রঙের পাথর চারিপাশে। পাহাড়ের মাথা আকাশ ছুঁয়েছে। পেছনে সূর্য গনগন করছে যার জন্য পাহাড়কে কালো লাগছে। এই কালোর ভেতর থেকে বেড়িয়ে আসছে দুধ সাদা জলের ফেনা রাশি। সকাল দশটার সময় মনে হচ্ছে যেন ব্রাহ্ম মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি। কেউ কোথায়ও নেই শুধু আমরা চারজন। প্রায় ষাট ফুট উপর থেকে জল সরাসরি আছড়ে পড়ছে না , একটু লতিয়ে লতিয়ে এসে কুণ্ডে পড়ছে । এই আসাটা রোমান্টিকতায় ভরা। নারীর কোমল শরীরের উষ্ণতাকে যেন সাজিয়ে তোলা। রূপের চমক নেই,আছে সিগ্ধতা।

দুই পাহাড়ের ভেতর থেকে নেমে আসছে 

গ্রামের নাম ঘোড়াখুর আর উষ্ণ প্রস্রবনের  নাম ঘোড়াখুর।কিন্তু কোথায় ঘোড়াখুঁড়? অশ্বমেধ যজ্ঞের সেই বিখ্যাত ঘোড়া নাকি এই পাহাড়ে এসে দাঁড়িয়েছিল । সেই ঘোড়ার পায়ের ছাপ নাকি আছে এই পাহাড়ে। সেই পুরাণের কাহিনী অনুসারে জলপ্রপাত এর নাম ঘোড়াখুর। ঘোড়ার পায়ের ছাপ দেখার খুব একটা ইচ্ছে আমার ছিল না বা নেই । আমি এসেছি ঝরনা দেখতে । সেটাই আমি ভালো করে দেখি । যেখানে এসে জল পরছে সেখানকার জলের রঙ একটু অন্য রকমের।অল্প হলুদের ছোঁয়া । পাশেই রয়েছে একটা সুন্দর লম্বা শিবের মন্দির । কোন পুরোহিত নেই । কোন মানুষজন নেই । সারা বছর খোলা থাকে মন্দির । অথচ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন । আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি কারণ উল্টোদিকের হাহা পঞ্চকুমারী পাহাড় আর হাবেলীখড়গপুর লেক। উল্কাপাতের পর সৃষ্টি হয়েছিল এই লেক সেই লেকের জল থেকে মনে হয় এই জলপ্রপাতের উৎস ।  

মন্দির 

ফেরার সময় একটা কাণ্ড হলো। আমাদের গাড়ির চালক বল্লেন এতো ঠান্ডায় ঠান্ডা জল দেখলেন , চলুন আর একটু গাড়ি করে গেলেই গরম জল দেখাব। আমি বলি সেটা কোথায় ? সে বলে ঋষিকুণ্ড উষ্ণ প্রস্রবণ । আমরা গাড়ি নিয়ে  পাড়ি দিলাম ঋষিকুণ্ডের দিকে ।  

কি ভাবে যাবেন : ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রেল যোগাযোগ রয়েছে ভাগলপুরের। হাওড়া থেকে জামালপুর এক্সপ্রেস ১৩০৭২ রাত ২১.৩৫ ছেড়ে সকাল ৫.৪০মি ভাগলপুর পৌঁছে যাচ্ছে । হাওড়া গয়া ১৯.৫০ ছেড়ে ভোর ৪.১০ মি. দিনের বেলা যেতে গেলে রয়েছে কবিগুরুএক্সপ্রেস  সকাল ১০.৪০ ছেড়ে রাত ২০.২৫ ভাগলপুর স্টেশনে ।  

ভাগলপুর থেকে জামুই যাবার রাস্তা ধরতে হবে। ভাগলপুর থেকে প্রায় ৯০ কিমি . জেলা মুঙ্গের।  গাড়ি নিয়ে চলুন ধাপরি মোড়। ধাপরি মোড় থেকে বাঁ দিকের চলে গেলেই ঘোড়াখুর গ্রাম। গ্রামের রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে যেতে হবে। তারপর হাঁটা পথ । ঘোড়া খুর জলপ্রপাতকে বিহার পর্যটন দপ্তর এখনো তাদের ম্যাপে আনেননি । কিন্তু ঋষিকুণ্ড পর্যটন দপ্তরের ম্যাপে স্থান পেয়েছে ।

মন্তব্যসমূহ

  1. খুব সুন্দর বর্ণনায় অজানা পথের বিবরণ

    উত্তরমুছুন
  2. খুব সুন্দর বর্ণনা।

    উত্তরমুছুন
  3. খুব ভালো লাগলো। নমষ্কার নেবেন 🙏

    উত্তরমুছুন
  4. খুব সুন্দর লেখা। আমি এরকম লেখা ভালোবাসি। আপনি ভালো লেখেন।

    উত্তরমুছুন
  5. খুব সন্দর লেখা,অজানাকে আবিস্কার .....

    উত্তরমুছুন
  6. Kato ajana jaiga ache, apnar lekha pare ghorar sad kichu ta mete. Khub sundar. Bhalo thakben.

    উত্তরমুছুন
  7. Khub valo laglo. Mone holo ami apner songe songe oi jaga ghure Alam.

    উত্তরমুছুন
  8. দারুন লেখা। আমার মানস ভ্রমণ হয়ে গেল

    উত্তরমুছুন
  9. নিজের চোখে একবার দেখেছি।আপনার চোখে আবার দেখলাম। চমৎকার!

    উত্তরমুছুন
  10. আপনার বর্ণনায় কতো অজানা জানা হলো। ধন্যবাদ, আরো লেখা চাই।

    উত্তরমুছুন
  11. খুব ভালো লাগলো..ইতিহাস,ভূগোল ,সাহিত্য ও পুরাণের মেলবন্ধন ..

    উত্তরমুছুন
  12. অজানা অচেনা স্থান, তাকে জানার আনন্দ উপভোগ করলাম আপনার এই সুন্দর লেখা থেকে। চালিয়ে যান দাদা আর আমরা উপভোগ করি।

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মধেরার সূর্য মন্দির

মিশর ভ্রমণের নান্দীমুখ।

হালিশহর এক দিনের ভ্রমণ।