দুধপাথরি Doodhpathri


দুধপাথরি

বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায় ।

মনে হয়েছিল বলে গেলাম ঠিক এরকম নয়। পরিকল্পনা আগে থেকেই  অবশ্যই ছিল, তবে সেটা মনে মনে। শ্রীনগরে এসে প্রতিবারই একটা নতুন জায়গায় যাই। আমার সঙ্গী হন ইরফান। সে আমাকে প্রতিবারই নতুন একটা করে জায়গায় নিয়ে যায়। এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দেন ইরফানের বাবা। কেননা তিনিও আমাদের সঙ্গী হন।
 সবুজের ভেতর  সাদা বরফ

বানিহাল থেকে শ্রীনগরের বড়গাঁও পর্যন্ত ট্রেন চলে ।  জায়গাটা  এক্কেবারে শ্রীনগর বিমানবন্দরের পেছনে ।বড়গাঁও একটি জেলাও বটে । বড়গাঁও রেলস্টেশনে আমি যাইনি । আমার যাওয়াটা আরো একটু দূরে । বিমানবন্দর থেকে দশ কিলোমিটার যাওয়ার পর আর কোন ভারতীয় সৈনিকের দেখা পায়নি । আঁকাবাঁকা অসমতল পথ ।রুক্ষ জমি । গাড়ির চাকা পাথরে পড়ে মাঝে মাঝে টলমল করে । আমাদের ছোট্ট গাড়িটা কতদূর আমাদের নিয়ে যেতে পারবে সে নিয়েও সন্দেহ ছিল আমার । যেহেতু ইরফান গাড়ির চালকের আসনে তাই সন্দেহ থাকলেও বিশ্বাস ছিল আমরা পৌঁছে যাব । আমি ইরফান,  ইরফানের কাকা ও বাবা । এই চারজন যাচ্ছি আমরা দুধপাথরি দেখতে । যাবার পথে ছোট ছোট কাশ্মীরি গ্রাম । আকাশে রোদ ঝলমল করছে । পেঁজা তুলোর মতো নীল আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে ছোট ছোট মেঘের বাসা । রাস্তার বাঁক গুলো এমন যে ডান দিকে যাব না বা দিকে তে যাব বোঝা বেশ দুষ্কর হয়ে উঠছিল । ইরফান গাড়ি থামিয়ে একটা দোকান থেকে কিছু শুকনো খাবার সঙ্গে নিল । আর বলল দাদা চা পাওয়া যাবে না কিন্তু এখানে চা টা খেয়ে নিন । কাশ্মীরের লবণ চা খেতে পারব না জেনে লিপটন চায়ের অর্ডার দিলাম আমরা চারটে । বড়গাঁও জেলাটি পুরোটাই কৃষিনির্ভর । আমি একটি কৃষি সমবায়ের দোকান থেকে টমেটোর বীজ , বেগুনের বীজ বিভিন্ন রকমের কাশ্মীরি শাকের বিচ কিনে নিলাম । এসব দেখে ইরফান হাসতে হাসতে বলল দাদা এগুলো শীতের দেশে হয় আপনার ওখানে একটা গাছও হবে না । আমি মনে মনে বলি শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা !
 বরফ কেটে রাস্তা তৈরি হচ্ছে। 


গল্প করতে করতে সময় কাটে রাস্তা কমে না ! শ্রীনগর থেকে মাত্র চল্লিশ কিলোমিটার দূরে !  তিরিশ কিলোমিটার যাওয়ার পরও আমি আমি কোন বরফ দেখতে পাইনি ।রাস্তায় পড়বে মুজপাথরি নামের ছোট্ট পাহাড়ি এলাকা৷ চারদিকে পাহাড় ঘেরা এ জায়গা একেবারে সবুজে-সবুজ৷ ইতিউতি দাঁড়িয়ে থাকে ছোট ছোট বাড়ি৷ মুজপাথরি ছেড়ে খানিকটা পথ পেরোলেই এসে পড়বে দুধপাথরি৷ কোথাও কোথাও সরু বরফের রেখা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পিরপাঞ্জাল । পাইন ফার ও উইলো গাছের রেখা দেখে বুঝি পাঁচ হাজার ফুট ওপরে এসে পড়েছি । পাঁচ কিলোমিটার আগেই পাইন গাছের গোড়ায় দেখতে পেয়েছি দুধ সাদা বরফের প্রলেপ । যত এগোচ্ছি বরফ আমাদের সামনে এগিয়ে আসছে । আবার একটু চায়ের তৃষ্ণা পেল । পাওয়ার একটু কারণও ছিল , কাশ্মীরি মানুষেরা রুপোর পাত্রের মত বড় বড় পাত্রে চা করে রেখেছেন  । ইরফানের বাবা রাস্তার উপর বসে থাকা চায়ের দোকান থেকে কয়েকটা রুটি কিনে নিলেন । এরকম রুটি নাকি শ্রীনগরে পাওয়া যায় না । দুধপত্রিতে এসে দুধ ছাড়া  কাহওয়া চা খেলাম। ল্যাম্ব কারি, গোলাপিরঙা চা ‘শির’, কোশের তামোল চালের ভাত, রাজমা-শালগমের তরকারি, জাফরান দেওয়া চা ‘কাহওয়া’ ও রোগনজোশ সবই পাওয়া যাচ্ছে দেখে মনে হলো। আরো দু কিলোমিটার যাওয়ার পর আমাদের গাড়ি আটকে গেল বরফে । বেলচা দিয়ে বরফ কেটে রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে । গাড়ি একবার ফেঁসে গেলে আর বের করা যাবে না এই ভয়ে আমরা গাড়ী থেকে নেমে পড়লাম ।
 বরফ নিয়ে খেলা 


 দুধপাথরি’ শব্দটার অর্থ দুধ ভর্তি পাথর বা দুধের উপত্যকা! এই নামের পিছনে লুকিয়ে আছে একটা গল্প।
যে গল্প স্থানীয় মানুষদের কাছ থেকে শুনতে পাবেন। অনেককাল আগে এই কাশ্মীর উপত্যকায় বাস করতেন এক ধর্মপ্রাণ মানুষ। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, গীতিকার ও সুফি সাধক। সেই মানুষটার নাম শেখ নূর-উদ্দিন নূরানী।  শেখ নূর-উদ্দিন নূরানী  একদিন পাহাড় পেরিয়ে এই পথ দিয়ে যেতে যেতে সময় গড়িয়ে আসে নামাজ পড়ার জন্য।  নামাজের সময় হয়ে যাওয়ায় পথের মধ্যে ঘাসে ঢাকা এক অজানা মাঠে থামতে বাধ্য হন তিনি। নামাজের আগে অজু করতে জল দরকার। এদিকে আশেপাশে নদী বা ঝরনা কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না । খুবই মুশকিলে পড়লে কবি নূর। জল খুঁজতে গিয়ে মাঠের শক্ত মাটিতে লাঠি দিয়ে আঘাত করেন তিনি। সেই আঘাতে আশ্চর্যভাবে মাটি ফেটে বেরিয়ে আসে দুধের ধারা।
 দুধ বেরোতে দেখে বিস্মিত হয়ে বলে ওঠেন  : এ দুধ দিয়ে কী করব আমি! দুধ পান করা যেতে পারে, কিন্তু তা দিয়ে অজু করা তো যাবে না। সাধকের মুখে এ কথা শোনামাত্র দুধের সেই ধারাই বদলে যায় স্বচ্ছতোয়া জলে। পাহাড়ের উপরে ঘাসজমির মধ্যে দিয়ে সেই দুধেল জল না কি আজও বয়ে যায়। আর এই ঘটনার পরই এই ঘাসে ঢাকা উপত্যকার নাম হয়ে যায় দুধপাথরি।
 যেদিকে তাকাই শুধু বরফ 


আমি আমার মত বলার মধ্যে একটা অহংকার থাকে । আমি এমন একটা জায়গার মধ্যে প্রবেশ করলাম সে নিজেকে বলে না আমি আমার মত । তবে সে কার মত ? আমার চোখে সে তার মতই ! ৮৯৬০ ফুট উঁচুতে সাদা টানটান সমুদ্রের মধ্যে সে একা দাঁড়িয়ে । এটাই  দুধপাথরি।
 ইরফান ও তার বাবা ও কাকা 


না এটা গুলমার্গ না এটা শোনামার্গ। দুধপাথরি কারোর মতো নয় । এক্কেবারে ভার্জিন বরফ । ভূস্বর্গের মাথায় নতুন পালক । কোথাও বরফে এতোটুকু কাদার ছিটে নেই। দুধ সাদা ফেনার সমুদ্র ।  জায়গাটি সত্যিই একটি লুকানো রত্ন ।  আছে স্পষ্ট সাদা নদীর সাথে একটি ব্রিজ। সে ব্রিজের আমি দেখা পাইনি । সে ছিল বরফে নিচে । উপচে পড়া বিস্তৃত ভূমি, বিস্তীর্ণ পাইন গাছ এবং একটি সুন্দর আবহাওয়া যুক্ত পরিবেশ । দুধপাথরি মানে ভ্যালি অফ মিল্ক । দুধের উপত্যকা' । যে রাস্তা ধরে আমরা হেঁটে যাচ্ছি তার দুপাশে পাঁচ ফুট করে বরফের পাঁচিল । আমাদের হেঁটে যেতে হবে আরও দু কিলোমিটার সেখানেই আছে দুধ নদী । আমরা নদীর শব্দ পাচ্ছি কিন্তু চোখে দেখা পাচ্ছিনা । বরফের  তলা দিয়ে নদী বয়ে চলেছে । দুধপাথরির চারপাশ মখমলের মতো নরম সবুজ ঘাসে ঘেরা৷ দূরে দূরে দাঁড়িয়ে থাকে পাইন বন৷ সবুজ উপত্যকায় ছবির মতো ঘুরে বেড়ায় ভেড়া-ঘোড়ার দল৷ ট্যুরিস্ট রিসেপশন পেরিয়ে পৌঁছতে হয় পরিহাজ নামের জায়গায়, স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় ‘পারেজ’৷  আকাশটা নীল হয় । এখানে আকাশ যেন সাদা ! সাদা বরফের বিরাট সমুদ্র ,সেই সমুদ্র আস্তে আস্তে তাবুর মত আকাশ ছুঁয়েছে ।
যখন বরফ থাকে না তখন উপত্যকায় সবুজের বাগিচায় ছোট ছোট ফুলের আনাগোনা।
আমি যখন সুইজারল্যান্ডের মাউন্ট টিটলসে উঠেছিলাম , সবাই মিলে আমাকে বলেছিলেন সুইজারল্যান্ড সুইজারল্যান্ড ই হয় । মনে হচ্ছে তাদের একবার ডেকে বলি আসুন একবার দেখে যান  দুধপাথরি।
 যাওয়ার পথ



কীভাবে যাবেন:
যে কোন ট্রেনে জম্মু অবধি গিয়ে বাসে বা ছোট গাড়িতে শ্রীনগর পৌঁছন৷ ফ্লাইটে গেলে দিল্লি হয়ে শ্রীনগর বিমানবন্দর৷ শ্রীনগর থেকে গাড়িতে দুধপাথরি পৌঁছে যান৷ ছোট-বড় দু’ধরনের গাড়ি পাবেন৷ ঘন্টা দুই সময় লাগবে। তবে প্রথমদিন শ্রীনগরে থেকে যাওয়াটাই ভালো।

শীতে বরফ পড়ে দুধপাথরির রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়৷ এপ্রিল থেকে অক্টোবর খুব ভাল সময়৷

কোথায় থাকবেন:

দুধপাথরি হাটমেন্ট এরিয়াতে দুধপাথরি ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের দ্বিশয্যার হাট রয়েছে৷ পর্যটক কম হওয়ায় সমস্ত সুযোগ-সুবিধা না-ও মিলতে পারে৷ তাই যাওয়ার আগেই বুকিং করতে হবে৷ শ্রীনগরে থাকার জায়গা প্রচুর৷ সেখানে থেকেও গাড়ি করে ঘুরে নেওয়া যায় দুধপাথরি।


মন্তব্যসমূহ

  1. Khub manojog sahokare porlam..mone holo dudher swarge vese berachhi..satti ee khub sundar..khub valo laglo...

    উত্তরমুছুন

  2. অসাধারণ একটা লেখা পড়লাম। মন ভরে গেল। কাশ্মীরে গেছি এটা দেখা হয়নি এটার জন্য হয়তো আবার যেতে হবে কাশ্মীর

    উত্তরমুছুন
  3. Ek kothy asdhrn lekha. Erkm lekh aro chai

    উত্তরমুছুন
  4. বেশ ভালো লেখা,লেখার মধ্যে নতুনত্ব আছে।

    উত্তরমুছুন
  5. দুর্দান্ত লেখা। হারিয়ে গেলাম দুধপাথরির রাস্তায় রাস্তায়। কাশ্মীর গেলে এখানে যেতেই হবে।

    উত্তরমুছুন
  6. খুব সুন্দর বর্ণনা।যাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  7. খুব সুন্দর লেখা👌পড়ে মনে হয় চলে যাই দুধপাথরি

    উত্তরমুছুন
  8. ভালো লাগলো লেখাটা পড়ার পর যাওয়ার ইচ্ছেটা ডানা মেলে উঠলো 😁

    উত্তরমুছুন
  9. খুব সুন্দর লেখা। আমি কাশ্মীর গেছি। এখানে যাই নি।

    উত্তরমুছুন
  10. এ এক নতুন কাশ্মীর

    উত্তরমুছুন
  11. , আমি কাশ্মীর ঘুরে এসেছি2019.এ। দারুন , লিখেছেন


    উত্তরমুছুন
  12. খুব সুন্দর করে লিখেছেন দাদা, খুব ভালো থাকবেন।

    উত্তরমুছুন
  13. नमस्कार मैं आप लोगो को सूचित कर रहा हूँ कि अगर आप लोगो मे से कोई भी कश्मीर घूमना चाहते है तो हम ट्रेवल का काम देखते सभी प्रकार की गाड़ी कश्मीर के जितने भी घूमने की जगह है उसके लिए हम गाड़ी उपलब्ध करवाते है आप लोगो को कोई जानकारी चाहिए तो कभी भी मेरे नंबर पर काल कर सकते हैं।
    धन्यवाद

    मोबाइल नंबर 09596406350
    09596514182

    উত্তরমুছুন
  14. পড়ে ও ছবি দেখে আপ্লুত হলাম। ভবিষ্যতে আরও কিছু জানার ইচ্ছা রইল। ধন্যবাদ।

    উত্তরমুছুন
  15. Local train e ei khane ki jawa jai,,budgum

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মধেরার সূর্য মন্দির

মিশর ভ্রমণের নান্দীমুখ।

হালিশহর এক দিনের ভ্রমণ।