মিশরের কত রকম ঈশ্বর।

মিশরের দেবী ও প্রকৃতি

বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায়

সরস্বতীর হাঁস তিনিও কি পড়ান ইতিহাস?' হ্যাঁ তিনিও পড়ান ইতিহাস। কিসের ইতিহাস? মানব সভ্যতার ইতিহাস। মিশরীয় পুরা কীর্তি জাদুঘরে  গিয়ে দেখছি নতুন সভ্যতার মূর্তির পাশে বসে আছেন হাঁস। অনেকটা আমাদের সরস্বতীর মত। হাতে বীনা না থাকলেও পাশে বসে আছেন তার বাহন। আফ্রিকা হয়তো প্রথম মানুষের জন্ম দিয়েছে এবং মিশর সম্ভবত প্রথম মহান সভ্যতার জন্ম দিয়েছে, যা প্রায় ৫,০০০ বছর পরেও বিশ্বজুড়ে আধুনিক সমাজকে মুগ্ধ করে চলেছে। মিশর ঘুরতে ঘুরতে এত ইতিহাস কে আমি দেখেছি আর এত দেব-দেবীর কথা আমি শুনেছি তাতে আমার মনে হয়েছে ভারতীয় দেবদেবীর চেয়ে অনেক বেশি দেব দেবীর জন্ম হয়েছে মিশরে। আর ইতিহাসের কথা বলছেন মা সরস্বতী।

 প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য আমাদের দেশে পশু পাখিকে আমরা পুজো করি। সূর্য চন্দ্র বাতাস মাটি সকলকে পূজা করতে শিখিয়েছে ভারতীয়রা। সবকিছুর ভেতরেই নির্মাণ আর সৃষ্টির একটা আধার  তৈরি করে রেখেছেন দেব-দেবীরা। একদিকে যেমন দেব- দেবী  অন্যদিকে তেমনি  অ -সুর। সবকিছুরই একটা প্রাধান্য আছে। মিশরে গিয়ে মনে হয়েছে আরো আরো এমন দেবতা আছেন যাদের সৃষ্টি আর নির্মাণ আমাদের বিস্ময়ের চোখে ভাবতে হয় ও দেখতে হয়। মা দুর্গাকে আমরা সিংহের সাথে দেখেছি। মিশরে গিয়ে দেখলাম সিংহেরও দেবতা আছে। শিয়ালকে আমরা খুব একটা পুজো করি না 'শিবা'বলে ভক্তি করি। মিশরের ইতিহাসে শিয়ালের অবদান প্রচুর। মিশরের যেকোনো মন্দির গেলেই  আপনি শিয়াল রূপী দেবতা অনুবিসকে দেখতে পাবেন। শকুনকে আমরা খুব একটা ভালো চোখে দেখি না কিন্তু মিশরে গিয়ে দেখেছি শকুন রূপী দেবতা নেকবেথকে।

 প্রকৃতির রূপরেখা অনুসারী মনে হয় দেব-দেবী সৃষ্টি হয়। ভয় ও ভক্তি থেকেই দেবতাদের পূজা হয়। মিশরের একদিকে যেমন মরুভূমি অন্যদিকে নীলনদ। যার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে একদিকে মরুভূমির দেবতা অন্যদিকে  নীল নদের দেবতা।

সেথ : ছিলেন মরুভূমি, ঝড় ঝঞ্ঝা ও ধ্বংসের দেবতা। আর ওয়াদজ-ওয়ের  : ভূমধ্যসাগর এবং নীলনদের বদ্বীপভূমির অন্যান্য জলাশয়ের অধিকর্তাও দেবতা। গাইডের  ইংরেজি আমরা খুব একটা ভালো বুঝতে পারছিলাম না। তার জন্য দু একটা বই ও কিনেছিলাম ওখানে গিয়ে। সেখানে শুনেছিলাম অসাধারণ এক দেবতার কথা। তার নাম টেফনাট :যিনি বৃষ্টি, শিশির এবং আর্দ্রতার দেবী। ভাবা যায় না এরকম একজন দেবী হতে পারেন! রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে সাজানোর জন্য যে ভাবে মন্ত্রিসভা গঠন করা হয় সেই ভাবেই গঠন করা হয়েছে  দেব দেবীদের।

নেইথ - নিম্নভূমির পূজিতা দেবী। সৃষ্টি এবং শিকারের দেবী । নেখবেট  - উচ্চভূমির দেবী। নেপিত  - শস্যের দেবী। নুট  - আকাশের দেবী।বেনি হাসান  - এলাকায় পূজিতা। (মানে লোকাল দেবী)  রেনেনুতেত - চাষবাসের দেবী। 


সাতেত - মিশরের দক্ষিণ ভাগের উপাস্য দেবী 

সেখমেট - যুদ্ধের দেবী। পুরুষ দেবতার ক্ষেত্রে ঠিক এইভাবেই ভাগ করা হয়েছে।

অনেক দেবদেবীদের মধ্যে  একজনের কথা আমি বলব যার কথা গাইডের মুখে দু -একবার শুনেছি। আমার বারবার মনে হয়েছে  তিনি হয়তো আমাদেরই সরস্বতী। গাইড বলেছিল : হাথোর মিশরের অন্যতম প্রধান উপাস্য দেবী। প্রধানতঃ সঙ্গীত, প্রেম এবং মদিরার দেবী। একই সাথে তিনি মাতৃত্ব এবং সৃষ্টির দেবী। ডেনডেরায়ের দেবী হাথোরের উপাসনালয়। তিনি কুমারী মেয়েদের রক্ষাকারী এবং ফারাও এর অন্নদাতা। দেবতা হোরাসের পত্নী। সিনাই-এর খনি অঞ্চলের দেবী। অনেক মিশরীয় দেবতার মত, হাথোর মাঝে মাঝে পশুর রূপ ধারণ করতেন । তিনি কখন শকুন, কখন গরু বা কখনো একজন মানুষের রূপে দেখা গেছে। তাকে প্রায়শই নানা রূপে  চিত্রিত করা হয়েছিল। তাকে মানুষ রূপে চিহ্নিত করা হয়েছে কারণ তার লম্বা কালো চুলে দেখে।একটি ফিতে দিয়ে বাঁধা এক জোড়া গরুর শিং এবং তার মধ্যে সূর্যের চাকতি। শিংগুলির মধ্যে ডিস্কের বা এন্টেনা বলতে পারেন )উপস্থিতি সূর্য দেবতার সাথে তার সংযোগের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। তিনি একটি মুকুট পরতেন  যা রাজকীয় দেবতা এবং মানুষের কপালে দেখা যায়। সোজা একটি সাপও আছে তার মাথায়,যা আসলে রাজ পরিবারের সাথে তার সংযোগের একটি চিহ্ন।

 অনেক কিছুই আমাদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়। বিশ্ব ধর্মের অনেক দেবদেবীর কিছু কিছু ভূমিকা রয়েই গেছে এই বিশ্বে। প্রত্যেকেরই একটা নিজস্বতা ছিল। প্রত্যেকেই এক একটি একক। এদের যদি ঐশ্বরিক মূর্তি তৈরি করা হয় তবে তাদের চরিত্র সহজেই বর্ণনা করা যায় , তবে এটা হাথোরের ক্ষেত্রে কোন দেবতার সাথে মিল নেই ।  সৃষ্টির যত গল্প আছে তাতেই তিনি  উদ্ভবের নীতি হিসাবে আবির্ভূত হয়েছেন । একই ভাবে আকাশের মহান মাতৃদেবী তিনি। আবার তাকে  উল্লেখ করা হয় গাছের প্রতীকী হিসাবে । তিনি আবার ছিলেন প্রেমের লোভনীয় দেবী। বলা হয় তিনি নাকি একই সাথে তিনটি ধর্মকে পালন করেছিলেন। একদিকে তিনি ছিলেন মা। সমস্ত রাজার সহধর্মিণী এবং আদর্শ রাণীর বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছিলেন। রাজাদের সাথে জাদুতেও পারদর্শী ছিলেন ,বিশেষ করে নিরাময় জাদুতে, যা পৌরাণিক কাহিনীতে হাথরের প্রধান বৈশিষ্ট্য। যাঁর উচ্ছ্বসিত সাধনা নীল নদের প্লাবনভূমিতে জড়িয়ে আছে অদ্ভুত একটি মিথ।

হোরাস

তবে একটা কথা বলি মিশরে দেবদেবীর অভাব নেই। তবে তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নাম শুনেছি  হোরাসের কথা। কে এই হোরাস? হোরাসের বাবা ছিলেন ওসিরিস। যাকে তার ভাই স্বেত বন্দি করে ক্রুসে চড়িয়ে হত্যা করেছিলেন। হোরাসের মা ছিলেন আইসিস। আইসিস ওসিরিসকে জাদুবলে বাঁচিয়ে তুলেছিলেন  কয়েক ঘন্টার জন্য। কি ভাবে বাঁচিয়ে তুলেছিলেন কি ভাবে আইসিস তার স্বামী খুঁজে পেয়েছিলেন সে গল্প অনেক বড়। যাই হোক জীবিত হবার পর ওসিরিস ও আইসিস মিলিত হন। সেই সময়ে ঈশ্বরের বাণী ঘোষিত হয় ওসিরিসের সন্তান হবেন পরবর্তী রাজা। এক গুহার মধ্যে লুকিয়ে থেকে আইসিস তার সন্তানের জন্ম দিলেন ২৫ শে ডিসেম্বর।তাঁদেরই সন্তান হোরাস।হোরাসের মুখটা বাজপাখির মতো। এক চোখে সূর্য এক চোখে চন্দ্র।মিশরে গিয়ে শুনেছি এখনো নাকি ২৫শে ডিসেম্বর যীশুর  জন্মদিনে  হোরাসের জন্মদিন পালিত হয়।

মন্তব্যসমূহ

  1. স্বাভাবিক ভাবেই যেমন সুন্দর লেখা তেমন ছবি।

    উত্তরমুছুন
  2. অসাধারণ !তবে খুব মনোযোগ দিয়ে না পড়লে গুলিয়ে যাবে।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. না ঘুরিয়ে যাবে না. নাম গুলো কঠিন ভালোভাবে পড়লে মনে থাকবে

      মুছুন
  3. Kato ki jntey parlm dafa ..Apnar lekha pore mugdho holam..Darunnnn..

    উত্তরমুছুন
  4. সুন্দর লেখা, সমৃদ্ধ হলাম।

    উত্তরমুছুন
  5. যতবারই পড়ি ততই যেন জ্ঞান সাগরে ডুব দি ...

    উত্তরমুছুন
  6. নীল নদের সভ‍্যতার বিকাশে, আসলে সব প্রাচীন সভ‍্যতার বিকাশেই প্রকৃতির আচরণকে কেন্দ্র করে দেব-দেবীর কল্পনা করা হয় । আর তাতে বিভিন্ন আখ্যান যুক্ত হয়ে সামাজিক ইতিহাস তৈরি হয় । যা বংশ পরম্পরায় চলতেই থাকে ।
    ---তাপস গুহ। 23/12

    উত্তরমুছুন
  7. অনেক অজানাকে জানতে পারলাম।

    উত্তরমুছুন
  8. অনেক অজানা তথ্য জানা গেলো।

    উত্তরমুছুন
  9. অসাধারন অনেক অজানা তথ্য জানতে পারি ।মুগ্ধ হলাম ভ্রমণ পিপাসু যারা তাদের জন্য এই লেখা শানিত কলম এগিয়ে চলুক শুভেচ্ছা অফুরান

    উত্তরমুছুন
  10. আমার স্বপ্নের জায়গা | জানি না, কখনো যাওয়া হবে কিনা | 😰

    উত্তরমুছুন
  11. মিশরের অনেক দেবদেবী আছে তা আগে ই জেনেছি কিন্তু হাঁস নিয়ে কোন দেবী আছে মিশরে তা জানা ছিল না।পড়ে সমৃদ্ধ হলাম, ধন্যবাদ আপনাকে।

    উত্তরমুছুন
  12. অনেক কিছু জানলাম

    উত্তরমুছুন
  13. অসাধারণ প্রতিটি সভ্যতার সঙ্গে দেবদেবীর যোগাযোগ থাকতে হবে।

    উত্তরমুছুন
  14. Thanks, khub bhalo laglo, onobohddho, ei rokom lekha aaj porjonto paini.

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মধেরার সূর্য মন্দির

মিশর ভ্রমণের নান্দীমুখ।

হালিশহর এক দিনের ভ্রমণ।