মিশর ভ্রমণের নান্দীমুখ।

মিশর ভ্রমণের নান্দীমুখ

বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায়।

তখনো ত্রিভুজ কাকে বলে জানতাম না। ছোটবেলায় ইতিহাসের বইতে দেখতাম ত্রিভুজের মতো আঁকা কয়েকটা ছবি।এগুলোকে বলা হতো পিরামিড। এই পিরামিডের ছবিগুলো আমার কাছে ছিল খুব প্রিয়। পাতা উল্টে উল্টে বারবার এই ছবিগুলো কে দেখতাম। তখনো জানতাম না পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের মধ্যে একটি আশ্চর্য পিরামিড। ভালোলাগাটা এমন ভাবে গেঁথে গিয়েছিল বুকের ভেতর তাকে সরানো খুব মুশকিল ছিল। বহু বছর ধরে লালিত করেছি পিরামিড দেখার বাসনাটা। আর কৈশোরে একটা প্রশ্ন খুব মুখস্ত করতে হতো মিশরকে কেন নীল নদের দান বলা হয়। নীলনদ আর পিরামিড আমার দুচোখে ছিল দুটি রেখা । ভাবিনি কোনদিন এই নদ,এই পিরামিডকে কখনো স্পর্শ করতে পারব।



কায়েরো শহরে আসার পর ঘোড়ার গাড়ি, হলুদ রঙের বাড়ি, বড় বড় ফুলকপি,মস্ত বড় বড় বাঁধাকপি দেখতে দেখতে, হঠাৎ দেখা মিলল ছোটবেলার সেই ত্রিভুজের মাথাটা। আমি চোখ বন্ধ করেছিলাম।কেন না,আমি তোমাকে সামনে থেকে দেখব। দূর থেকে নয়। তোমায় সামনে পেয়েও থমকে দাঁড়ায় মনের চোরা গলি। আজ আমি মিশরের কোনো নির্দিষ্ট জায়গা নিয়ে নিয়ে লিখব না। মিশর রহস্যের গল্প বলবো না। খুব ছোট্ট করে,পেন্সিল স্কেচের মত দু-একটা রেখা টানবো।গিজার পিরামিড নিয়ে এত লেখা এত ছবি আপনারা দেখেছেন যে পিরামিড নিয়ে আমি কোন নতুন রহস্য উন্মোচন করতে পারবো না।


 মিশরটা কেমন দেখতে একটু বলি। রাস্তায় যেতে যেতে আমার মনে হয়েছে রাজস্থানের জয়সালমীরের ভিতর দিয়ে চলেছি। হলুদ পাথরের ঘর বাড়ি,আর শুষ্ক পাহাড় দেখে হয়তো লাদাখের কথাও মনে হতেপারে। শুষ্ক বালির পাহাড়ের আশেপাশে কোন গাছপালা নেই। তবে সড়ক পথের চারিপাশে অসংখ্য খেজুর গাছ, আর অবাক করার মত কান্ড একদিকে বালিয়াড়ি ঠিক তার পাশেই সবুজ ক্ষেত। নীলনদের জলকে কাজে লাগিয়ে এখন মিশরে প্রচুর সবজি উৎপাদন হচ্ছে।কমলালেবু আর খেজুরের কোন অভাব নেই। আশ্চর্যের বিষয় কালো মাটিকে কাজে লাগিয়ে মাঠের পর মাঠ আখের চাষ হচ্ছে। মাত্র দুদিন আগে নেটে দেখলাম বাংলাদেশে কিছু মানুষ নীল নদীর ধারে জমি নিয়ে লাউ,পেঁপে, সীম, বরবটির চাষ করছেন। তবে একটা কথা উল্লেখ না করে পারছি না মিশরে এখনো চাষবাস হয় লাঙ্গল দিয়ে।নীল নদের জলে উর্বর শস্য শ্যামলা। সাহারা মরুভূমির কবল থেকে মিশরকে রক্ষায়,  কৃষি ক্ষেত্রে, জলবিদ্যুতের ক্ষেত্রে শিল্পোন্নতির ক্ষেত্রে পশু পালনের ও রেল ও সড়ক পরিবহনে নীলনদের অবদান বিরাট। বৃষ্টিহীন মিশরের মাত্র বাঁচিয়ে রেখেছে নীলনদ।


 মিশরীয় ইতিহাসকে যদি তিন ভাগে ভাগ করে নেন, তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে। ওল্ড কিংডম।সেই সময় রাজারা নিজেদের বলতেন তারাই সেরা। তাদের নির্মানও সেরা। মিডিল কিংডম আর নিউ কিংডম। ওল্ড কিংডমে তৈরি হয়েছিল বড় বড় পিরামিড। মিডিল কিংডমে রাজারা পাহাড় কেটে কেটে সুন্দর সুন্দর সমাধিক্ষেত্র তৈরি করেছিলেন। আর নিউ কিংডম কি করেছিলেন, না তাঁরা বড় বড় মন্দির বিশাল বিশাল পাথরের মূর্তি। ওল্ড কিংডমে তৈরি হয়েছিল ফারাও খুফুর গ্রেট পিরামিড।সেই সময়কার রাজধানী মেমফিসের কাছে অমরত্বকে ধরে রাখার জন্য গ্রেট পিরামিড তৈরি করলেন। হ্যাঁ, অমরত্ব তো পেয়েছেন বটেই।২৫৮৯ খ্রিস্টপূর্বের রাজার তৈরি পিরামিড দেখতে তো আমরা এখনো ছুটে যাই। বাবা ছেলে নাতি। তিনটি পিরামিডিই প্রায় একই জায়গায়। সেই সময়ের মেমফিস আজকের কায়রো। আমার মনে হয়েছে সেই সময়টা মহাভারতের প্রায় সমসাময়িক। কালের হিসাবটা একটু দি। যাদব শ্রেষ্ঠ শ্রীভগবান তিনি কেবল নরপতি নয় শ্রেষ্ঠ যাদব। কালান্তরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। কালের হিসেবটা কি? তার জন্মকালের হিসাবে সময়টা এক হাজার চারশ আটান্ন খ্রিস্ট পূর্বাব্দে। এই হিসেবটা আধুনিক ঐতিহাসিক কাল গণনা। পুরাণের অষ্টাবিংশ যুগ কলির সান্ধ্যা। কেউ বলেছেন দ্বাপরান্তর । যিশুখ্রিস্টের মত যদি কৃষ্ণ জন্মাব্দ বা কৃষ্ণাব্দ গণনা হতো , তা হলে যীশু জন্মের দুহাজার বাইশ সালকে  বলা হতো তিন হাজার চারশ ছিয়াত্তর সাল। রামায়ণ-মহাভারত ও পুরাণের বিভিন্ন গল্প কথা আমরা যেমন শুনি সেই ধরনেরই গল্পকথা সারা মিশর জুড়ে। মিশরীয় দেবদেবীর সঙ্গে ভারতীয় দেবদেবীর অনেকাংশে আমি মিল খুঁজে পেয়েছি। শুধু নামগুলোর পরিবর্তন হয়েছে। সাপ, কচ্ছপ,হাঁস গরু ময়ূর সবইতো প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য এদের পুজো করা হয়। ঠিক তেমনি মিশরেও এদের দেবতা হিসেবে গণ্য করা হয়। রামায়ণ-মহাভারতের যুগেও আমরা সোনার ব্যবহার দেখেছি। সেই রাজার মাথায় মুকুট সোনার।এখানেই ও তাই। মিশরের সোনা পাওয়া যেত না। সব সোনা আসতো লুবিয়ান দের কাছ থেকে। মিশরীয় রাজা রানীরা ভীষণভাবে মণিমুক্ত সোনার প্রতি আসক্ত ছিলেন। যার জন্য ভিন দেশ থেকে সোনা আনতে হতো। আমাদের দেশও পরিবার তন্ত্র ছিল সে দেশও অতিরিক্ত পরিবার তন্ত্র। নিজেদের রাজত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য,পরিবার তন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিয়ম করে নিজেদের বোনকে বিয়ে করতে হতো।

 দক্ষিণের ইজিপ্ট থেকে উত্তরের ইজিপ্ট বেশি সমৃদ্ধশালী।কেন না উত্তর ইজিপ্টে রয়েছে আসওয়ান, লুক্সারে ভ্যালি অফ দ্য কিংস, আবু সিম্বলের সূর্য মন্দির। দক্ষিনে আলেকজান্দ্রিয়ার মতো বড় বাণিজ্য পথ, কিছু স্থাপত্য করা থাকলেও। উত্তরের স্থাপত্যকলা দেখার জন্যই মিশর এতো আকর্ষণীয় বিভিন্ন মানুষের কাছে।

মন্তব্যসমূহ

  1. অসাধারণ!অপেক্ষায় ছিলাম।

    উত্তরমুছুন
  2. পড়ার অপেক্ষা তে ছিলাম। ছবির মতো লেখ।

    উত্তরমুছুন
  3. Apurbo. Na dekheo dekhte parchi. Asa koro jabo apnar songe.

    উত্তরমুছুন
  4. History is speaking as it were for our enlightenment through your illumination.

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. আমি ইতিহাসকে দিয়ে কত কথা বলাতে পারব আমি জানিনা। তবে আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি।

      মুছুন
  5. অসাধারণ। ছোটবেলায় পড়া ইতিহাস ও ভূগোল আর তার সঙ্গে আপনার অপূর্ব বর্ণনা একাকার হয়েগেছে। খুব ভালো লাগছে।

    উত্তরমুছুন
  6. Trivuj die shuru..... Shurutai ato chamokprado j puro lekha na pore thamai jayna.... Vari sundor.... Amra aro lekha pete chai

    উত্তরমুছুন
  7. Thank u.Tomar jonno abar Egypt k dekte parlam.Darun lekha

    উত্তরমুছুন
  8. বাহ্ খুব ভালো লেখা

    উত্তরমুছুন
  9. আপনার লেখায় মিশর ঘুরে এলাম।

    উত্তরমুছুন
  10. Ghurte jawar ichche roilo. konodin sujog hole jabo

    উত্তরমুছুন
  11. এত সুন্দর ভাবে ছোট্ট জায়গাতে আপনি লিখেছেন তার তারিফ করতেই হয়। আমার অসম্ভব ভালো লাগলো লেখাটি। এই ধরনের আরো লেখা চাই।

    উত্তরমুছুন
  12. খুব ভালো লাগলো..সমৃদ্ধ হলাম

    উত্তরমুছুন
  13. বেশ লিখেছেন,ছাত্রাবস্থায় ইতিহাসেও এতো বিস্তৃত বর্ণনা পড়িনি।লেখনী সুন্দর
    ভালো উপস্থাপন।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. আপনার মন্তব্য শুনে আমার খুব ভালো লাগলো ভালো থাকবেন

      মুছুন
  14. মিশরকে বড় আকর্ষনীয় করে উপস্থিত করেছেন স্যার।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. অনেক অনেক শুভেচ্ছা
      পরের লেখাগুলো পড়বেন মিশন নিয়ে।

      মুছুন
  15. খুউব ভালো লাগলো আপনার লেখা... অসাধারন অসাধারন... এমনিতেই মিশর দেশ টা কে কেনো জানি না বড্ডো কাছের মনে হয় ।আপনার লেখা পড়ে আরো যেনো ভালোবাসতে ইছে করছে নীল নদের দান এই মিশর কে...

    উত্তরমুছুন
  16. সুন্দর উপস্থাপনা।

    উত্তরমুছুন
  17. অনেক সমৃদ্ধ পূর্ণ তথ্য, পরের লেখার অপেক্ষায়।

    উত্তরমুছুন
  18. কাশ্মীর তো তখন স্বচক্ষে একেবারে দেখব। লেখাটি পড়ে খুব দেখার ইচ্ছে।

    উত্তরমুছুন
  19. আপনার লেখার সঙ্গে সঙ্গে মিশ্র ঘুরে নিচ্ছি ...অসাধারণ

    উত্তরমুছুন
  20. খুব সুন্দর লেখা আপনার লেখায় মিশর ঘুরে এলাম।

    উত্তরমুছুন
  21. Excellent description. এ এক অন্য অনুভূতি। সত্যি মনে হচ্ছে মিশরেই ঘুরে বেড়াচ্ছি ।।

    উত্তরমুছুন
  22. ভীষণ ভালো লাগল বামাদা।

    উত্তরমুছুন
  23. এতো তথ্য আপনার মগজে থাকে কি ভাবে? অসাধারণ। একদিকে মরুভূমির ফসল খেজুর উল্টো দিকে সবুজের সমারোহ।

    উত্তরমুছুন
  24. বাহ্,মুগ্ধতা যখন আরও কিছু খুঁজতে শুরু করল ,লেখা তখন শেষের পথ খুঁজল......

    উত্তরমুছুন
  25. বাহ্,মুগ্ধতা যখন আরও কিছুর খুঁজতে থাকল।লেখা তখন শেষের পথ দেখাল ....

    উত্তরমুছুন
  26. খুব সুন্দর লিখেছেন দাদা

    উত্তরমুছুন
  27. দাদা অসাধারণ লিখেছেন,তবে একটা ছোট্ট ভুল আছে শেষের দিকে লিখেছেন যে আলেকজান্দ্রিয়া ইজিপ্টের দক্ষিণে অবস্থিত আর আবুসিম্বল ও লুক্সর ইজিপ্টের উত্তরে অবস্থিত...আসলে এর ঠিক উল্টো টা হবে,আলেকজান্দ্রিয়া উত্তরে ভূমধ্যসাগরের ধারে অবস্থিত।

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মধেরার সূর্য মন্দির

হালিশহর এক দিনের ভ্রমণ।