মধেরার সূর্য মন্দির
মধেরার সূর্য মন্দির
বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায়।
পিতার অভিশাপে শাম্বের সারা গায়ে দেখা দিল কুষ্ঠ রোগ। অভিশপ্ত শাম্ব শাপমোচনের এবং মুক্তি ভিক্ষা চাইলেন পিতার কাছে । কৃষ্ণ পুত্রকে বললেন এই রোগ থেকে মুক্তি পেতে হলে সূর্য বন্দনা করতে হবে । দ্বারকা থেকে আস্তে আস্তে শাম্ব চলে এলেন পুরীর কাছে কোনারকে। তৈরি করলেন সূর্য মন্দির । সেটাই ভারতবর্ষে প্রথম সূর্য মন্দির ।
এবার আসি মূল রাস্তায়। মনুর কাল হিসাব যদি ধরি তা হলে খ্রিস্টপূর্ব ৫৯৫৮ + ২০২২ তার মানে হলো ৭৯৮০ বছর আগে ভারতে প্রথম সূর্য মন্দির তৈরি করে ছিলেন শাম্ব কোনারকে। (এই হিসাব আমার নয়,কালকূটকে এই হিসাব বিচার করে দিয়েছিলেন পন্ডিত শ্রীজীব ন্যায়তীর্থ মহাশয় )
প্রায় ৮ হাজার বছর আগে সূর্যকে দেবতা হিসেবে পুজো করা হলেও । পরবর্তী সময় সূর্যদেবের সেভাবে প্রচার ও মন্দির তৈরি হয়নি । বিশ্বাস করা হয় যে কোনারক মন্দিরটি ১২৫৫ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব গঙ্গ রাজবংশের রাজা নরসিংহদেব একে নিমাণ করেছিলেন। (আমি এটাকে পুনর্নির্মাণ বা পুনর্গঠন বলব) তার প্রায় ২২৯ বছর আগেই সোলাঙ্কি রাজা ভীমদেব মধেরায় (১০২৬) সূর্য মন্দির তৈরি করে ফেলেন । ভারতে প্রথম যদি বলা হয় রাজা দ্বারা নির্মিত সূর্য মন্দির তবে সেটা হবে মার্তণ্ড সূর্য মন্দির । কাশ্মীরের তৃতীয় রাজা ললিতাদিত্য ৭২৫ - ৭৫৬ সালে তৈরি করেছিলেন । ভগ্ন অবস্থায় থাকলেও শ্রীনগরে কাছে অবন্তীপুরে আমি এই মন্দিরটি দেখে এসেছি ।
পৌরাণিক ইতিহাসে দেখতে পাই প্রাচীন কাল থেকে দুটি প্রধান শক্তিশালী রাজবংশ ভারত সাম্রাজ্য পরিচালনা করছে।এই দুটি রাজ বংশের নাম সূর্য বংশ এবং চন্দ্র বংশ। রামায়ণ মহাভারত এবং পুরাণ গুলিতে এই বংশ দুটির শৌর্য, বীর্য, ধর্ম এবং পরাক্রম কীর্তিত হয়েছে। গ্রিক পুরাণে, হেলিয়স ছিল সূর্যের টাইটান দেবতা। রোমের
ইতিহাসে সূর্য দেবতার সাথে খেলাধুলা ও সংগীত জুড়ে আছে। অনেক ইতিহাস বলে ফেলেছি এবার আমার যাত্রা গুজরাটের মাহেসেনার কাছে মধেরা সূর্য মন্দিরে।
অন্তর্জগতে বাস করা যায় কিন্তু কখনই তা বর্ণনা করা যায় না । অন্তর্জগতের স্বপ্নের মতো যা কিছু তারই ছবি আঁকি তার সবকিছুকে নির্বাসিত করে সামনের দিকে । ফ্রানৎস কাফকার আমেরিকা উপন্যাসের এই লাইনগুলো আমার মাথায় ঘুরঘুর করছিল । আমার গাড়ির চালককে ফিস ফিস করে বলি : মাহেসনা এলো? হ্যাঁ এই তো মাহেসনা পার করে মধেরা আসছে। অন্তর্জগতের ছবি গুলো ভেসে আসছে। এর আগে আমি একবার এসেছিলাম মধেরা দেখতে। সে প্রায় কুড়ি বছর আগে । তখন টিকিট কেটে ভেতরে যেতে হতো না। এখন টিকিট লাগছে। ২০২১ ডিসেম্বরে মাসে তেমন শীত নেই। তবে রোদটার মধ্যে একটা রোমান্টিকতার ছোঁয়া আছে । এই রোদের জন্যই তো মন্দির । এই সূর্যই তো আরাধ্য দেবতা । তার থেকেই তো রোগ মুক্তি !
শুনশান ক্যাম্পাস।শীতের ঝড়ো হাওয়া ,দু-একটা পাতা উড়ে এসে গায়ে পরছে । এগিয়ে চলি মন্দিরের দিকে। মোবাইল ফোনে একজন প্রেমিকা পাথরে বসে তার প্রেমিককে বলছে এতদূর এসেছি , এত সুন্দর ভাস্কর্য দেখছি তুমি না থাকার বেদনা অনুভব করছি । সবই ভাগ্য!! আমি ভাবি একদিন কৃষ্ণ পুত্র শাম্ব যিনি সারা শরীরে কুষ্ঠ রোগের জ্বালা নিয়ে সূর্য মন্দিরের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনিই বলেছিলেন : "ভাগ্য অমোঘ। তাকে মেনে নিয়েই, দুর্ভাগ্য থেকে উত্তরণের সন্ধান করতে হয়। আমার কেন এমন দুর্ভাগ্য হলো, অপরের কেন হলো না, এইরূপ প্রশ্ন বাতুলতামাত্র। নিজের দুর্ভাগ্যের সঙ্গে অপরের তুলনা করে, আত্মাকে ক্ষব্ধ করা এবং কষ্ট দেওয়া ছাড়া আর কিছুই লাভ হয় না। নিজের কষ্টের জন্য কারোকে দোষারোপ করাও অবমর্যকারিতী ছাড়া আর কিছু না। কেন জরা আছে, ব্যাধি আছে, মৃত্যু ঘটে, এই সব নিয়ে মানুষে বিলাপ করে, শোকাকুল হয়। অথচ এসবের আরমণ থেকে কারোরই রেহাই নেই। বলবীর্যের দ্বারা শত্রু নিধন মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তিস্থ্থাপন যেমন ক্ষত্রিয়ের স্বধর্ম, তেমনি ব্যক্তির দুর্ভাগ্যের জন্য, তাকে একাকী সংগ্রাম করতে হয় "। শাম্ব দেবতাদের আহ্বান করেছিলেন সূর্য মন্দিরের পাশে বসবাস করার জন্য । মেয়েটির চোখে জল নেই , আবেগ আছে। সুন্দরী মেয়েটির মুখে ভাস্কর্যের ছাপ । আমি তখনো মন্দিরের ভাস্কর্য দেখিনি । তার আগেই বন্যর মতো একটা ভাস্কর্য আমার চোখের সামনে ফুটে উঠল । ভাবি এই কি সেই নারী যে একদিন শাম্বকে আহার ও বাসস্থান দিয়েছিল ?
সোলাঙ্কির রাজাদের তৈরি বিশাল গভীর একটা পুকুরের মত দেখতে পাচ্ছি; যাকে এখানে বলা হচ্ছে কুণ্ড । সমস্ত কুণ্ডটাই পাথরে পাথরে গাঁথা । তার মাঝে মাঝে ছোট ছোট মন্দির। পুরো ওয়াল স্টেপ। সোলাঙ্কি রাজারা এরকম আরেকটি ওয়াল স্টেপ বানিয়ে ছিলেন রনি কি ভাভে। সূর্য মন্দির, একাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বা প্রায় নয়শ বছর আগে সোলাঙ্কি রাজা ভীমদেব (AD 1016- 27) তৈরি করেছিলেন , এটি দেশের মন্দির স্থাপত্যের একটি উল্লেখযোগ্য রত্ন এবং গুজরাটের গর্ব। এটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে সূর্যের প্রথম রশ্মি বিষুবকালে সূর্য দেবতা সূর্যের প্রতিমূর্তির উপর পড়ে। আংশিকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও, মন্দিরটি তার আগের গৌরব ধরে রেখেছে। একটি গভীর জলাশয় উপেক্ষা করে একটি চূড়ার উপরে দাঁড়িয়ে, সূর্য মন্দিরটি এর অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক উভয় দিকেই চমৎকারভাবে খোদাই করা দেব-দেবী, ফুল এবং পাতা, পাখি এবং প্রাণীদের একটি আশ্চর্যজনক সমৃদ্ধি প্রদর্শন করে।
মধেরার পুরো চত্বরে প্রথমে কুন্ড, তারপর নাচের হল এবং সবশেষে মূল কাঠামো। আমরা প্রথমে মন্দিরটি দেখব কারণ এটি পুরো কমপ্লেক্সের নিউক্লিয়াস। পুরো কাঠামোটি একটি উঁচু প্ল্যাটফর্মের উপর দাঁড়িয়ে আছে যার উপরে রয়েছে মূল প্রাচীর । হলুদ রঙের বেলে পাথরের এতো ভাস্কর্য দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যায় । দেখব তো সবই । কিন্তু কিভাবে দেখব এইটা নিয়ে মনের ভেতর দ্বন্দ্ব ও ঝঞ্ঝা তৈরি করে। ভাবি পিলার দেখবো নাকি মন্দির দেখব? বিস্তৃত কমপ্লেক্স । এই কমপ্লেক্স কিন্তু একদিনে হয়নি বিভিন্ন সময়ে তৈরি হয়েছিল। মুক্ত-স্থায়ী নাচের হল, আর শোভাময় প্রবেশদ্বার অনেক পরে তৈরি হয়েছিল। আগে হয়েছিল মূল সূর্য মন্দির। মূল মন্দিরের উত্তর দিকে একটি মন্দির ছাড়াও কিছু ছোটখাটো কাঠামো রয়েছে। প্রধান মন্দির মনোমুগ্ধকর। মূল মন্দিরটি কমপ্লেক্সের কেন্দ্রবিন্দুতে । পূর্বমুখী মন্দিরটি ( ৯মি ১১.৫ মিটার বর্গ), উজ্জ্বল হলুদ বেলেপাথর দিয়ে তৈরি । এর দুটি প্রধান অংশ রয়েছে - সামনে একটি মন্দির এবং পিছনে একটি মন্দির (গর্ভগৃহ), দুটো মন্দিরে যাবার জন্য একটি সরু পথ দিয়ে যুক্ত করা হয়েছে । সারা মন্দিরে ভাস্কর্যের কথা আগেও বলেছি সারা মন্দির ঘুরে দেখলাম বাইরের দেয়ালে সূর্যদেব নানা ভাবে পাথরের ওপর প্রস্ফুটিত হয়ে আছেন । মন্দিরের ভেতরে বা কেন্দ্রে আটটি সজ্জিত কলাম দিয়ে একটি অষ্টভুজ তৈরি করা রয়েছে । ভিতরের দেয়ালগুলি বারো আদিত্যের মূর্তি দিয়ে সাজান, সবই সূর্য দেবতার রূপ, আসলে একটি সৌর বছরের বারো মাসের প্রতিনিধিত্ব করছে এই মূর্তি গুলো। মন্দিরটি এমনই জ্যামিতিক ভাবে তৈরি যে সূর্যের বিষুবরেখার অবস্থানকালে উদিত সূর্যের কিরণ সরাসরি মন্দিরের বিগ্রহ সূর্য দেবতার ওপর এসে পড়তো। সেই সময়কার মধেরা মন্দির আর নেই । তবে মন্দির প্রাসাদের ভেতর দেয়ালের বারোটি কুলুঙ্গিতে সূর্য দেবতার ১২ টি মূর্তি রয়েছে । সূর্য রশ্মি এসে দেবতাদের গায়ে পড়তো ।
সেই সময় (এখন)মনে করা হত সূর্যরশ্মি দিয়ে সমস্ত রোগকে নির্মূল করা যায় । কোন সময়ে কোন রশ্মি আসে আর সেই রশ্মি দিয়ে কোন রোগ নিরাময় করা যায় সেই শাস্ত্রও তারা জানতেন।
কোনারকের যেমন চন্দ্রভাগা নদী আছে । তেমনি মধেরার পাশ দিয়ে এক সময় বয়ে যেত পুষ্পাবতী নদী । এই নদীতে স্নান করে মানুষ পুজো দিতেন সূর্য মন্দির । নদী এখন অনেক দূরে চলে গেছে । তার বদলে মন্দিরের লাগোয়া কুণ্ডতে স্নান করে এখন মানুষ পুজো দেন সূর্য মন্দিরে । সোলাঙ্কি রাজারা এখান থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে পাটান রাজ্য স্থাপন করেন । সে আজ থেকে ১ হাজার বছর আগে । রাজারা বংশপরম্পরায় এই অঞ্চলে শৈব, বৈষ্ণব, সৌর, শাক্ত, জৈন মন্দির, তৈরি করেছিলেন।
শুধুমাত্র মন্দির স্থাপন করেই নয়, মন্দির এর সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছিল শিল্প কলার এক অনবদ্য রূপ। বিদেশী শত্রুর আক্রমণ এবং ভূমিকম্পে এই মন্দিরের বেশ কিছু অংশ নষ্ট হয়ে গেছে । মন্দিরের ভাঙা অংশগুলো কিছু কিছু বাইরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে । তবুও ১ হাজার বছরের পুরনো মন্দির যেভাবে উজ্জ্বল হয়ে আছে , তা সত্যিই দেখার মতো ।
এবার ফেরার পালা। ভাবি কুণ্ডে যাব। পাথরের সিড়ি দিয়ে ঘুরে ঘুরে নেমে পড়ি।এখানে রয়েছে অসংখ্য ছোট ছোট মন্দির। একদম নিচে নীল জল। নেমে পড়ি কুণ্ডে। অসাধারণ ছোট ছোট ভাস্কর্য আমাকে অবাক করে দেয় । এখান থেকে আমাদের আবার যেতে হবে রানী কী ভাভ দেখতে । সেটা এখান থেকে বেশি দূরে নয় মাত্র ৩৫ কি. মি। মন্দির কমপ্লেক্স থেকে বেরিয়ে বার বার পেছনে ফিরে তাকিয়ে থাকি মন্দির পানে। সেই মেয়ে টির সাথে আবার দেখা হয়। তাকিয়ে থাকি। না তার চোখের জলে কোন ভাস্কর্যের পরিবর্তন হয়নি !! আর এটাই মনে হয় চেয়েছিলেন কৃষ্ণ পুত্র শাম্ব মন্দির যেনো কোন পরিবর্তন না হয়।
কি ভাবে যাবেন একটু বলে দি : ভৌগলিক অবস্থানটা গুজরাটের উত্তর দিকে । আমেদাবাদ থেকে সরাসরি বাস আছে মাহেসানা। সেখান থেকে আবার বাস পরিবর্তন করে মধেরা আসতে পারেন । রেল পথে এলে দিল্লী-আমেদাবাদ রুটে পড়বে মাহেসানা। সেখান থেকে বাসে বা প্রাইভেট গাড়িতে আসতে পারেন । তবে আমেদাবাদ থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে মধেরা দেখে রানী কী ভাভ দেখে ফিরে আসুন আমেদাবাদে ।
আমেদাবাদে হোটেলের অভাব নেই। স্টেশনের আশেপাশে প্রচুর হোটেল। আগে থেকে বুকিং করার নেই।








Darun barnana o Tathya samridhya lekha. Bhalo laglo.
উত্তরমুছুনLikhe jan o Ammaderkeo abhabai samridhya karun.
Bhalo thakun.
আপনি আমার শুভেচ্ছা নেবেন
মুছুনSwapan Banerjee,Krishnanagar.
উত্তরমুছুনধন্যবাদ
মুছুনঅসাধারণ মনে হয় যেন কোন ভোমন কাহিনি পডছি।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ আপনাকে
মুছুনThanks, apnar poribeshoner kono tulona hoi na,khub-khub bhalo laglo. Samriddho Hola.
উত্তরমুছুনঅশেষ ধন্যবাদ
মুছুনSamriddho holam.
উত্তরমুছুনআন্তরিক ধন্যবাদ
মুছুনDarun hoyeche
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক শুভেচ্ছা
মুছুনখুবই সুন্দর
উত্তরমুছুনঅনেক শুভেচ্ছা
মুছুনDadun Lekha
উত্তরমুছুনধন্যবাদ জানাই
মুছুনInformative
উত্তরমুছুনধন্যবাদ
মুছুনNice verynice
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক শুভেচ্ছা
মুছুনNice verynice
উত্তরমুছুনপড়ার জন্য পড়া নয় জানার জন্য পড়া
উত্তরমুছুনThanks
মুছুন