প্রথম ভ্রমণ মায়ের সঙ্গে

প্রথম ভ্রমণ  মায়ের সঙ্গে।

বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায় 

আমি যত গ্রাম দেখি মনে হয় মায়ের শৈশব।

আমি যত গ্রামে যত মুক্তক পাহাড়শ্রেণী দেখি

মনে হয় প্রিয়ার শৈশব।

পাহাড়ের হৃদয়ে যতো নীলচে হলুদ ঝর্ণা দেখি

মনে হয়

দেশগাঁয়ে ছিল কিন্তু ছেড়ে আসা প্রতিটি মানুষ।

ঝর্ণার পাশেই নদী,নদীর শিয়রে বাঁশের সাঁকোর অভিমান

যেই দেখি, মনে হয়

নোয়াখালী, শীর্ণ সেতু, আর সে-নাছোড় ভগবান।


কবিতাটি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের লেখা। যতবার পড়েছি ততবার ভেবেছি আমার মায়ের শৈশবের কথা। আমার মায়ের কোন গ্রামের  শৈশব ছিল না। নোয়াখালী, শীর্ণ সেতু, বা  মুর্শিদাবাদের মতিঝিল,গ্রামের বাড়ি থেকে আসা খেজুরের রস, কিছু্ই নেই । মা  হালিশহরে বড় হয়েছেন আর হালিশহরেই বিয়ে হয়েছে। মায়ের সঙ্গে মামার বাড়ি যাবার কোন স্মৃতি আমার নেই । তার কারণ দু পা গেলেই আমার মামার বাড়ি। কিন্তু মায়ের সাথে ভ্রমণের কথা আমার মনে আছে।মায়ের সঙ্গে অনেক জায়গায় ভ্রমণ করেছি। সব জায়গার কথা আমি বলছি না ।  আমি বলবো মায়ের সঙ্গে প্রথম ভ্রমণের কথা । খুব অস্পষ্ট জীর্ণ হলুদ রঙের ছবি আমার মনে আছে। তখন আমি কত হবো ৫ বছর । গিয়েছিলাম হরিদ্বার আর বেনারস । পাঁচ বছর বয়সে আমার মাথায় কি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল আমি জানিনা। সেই স্মৃতির টুকরো ছবি আর ছোট ছোট ভাবনা পোকা, আমায় সারা জীবন কুড়ে কুড়ে খেয়েছে। না, আমি লোটাকম্বল নিয়ে সে ভাবে কোনদিন বেরোই নি। সপ্তবদ্রি করার সময় সে ভাবনা একবার মাথায় এসেছিল বটে, তবে তাকে আমি স্থান দিইনি।

 শিশু মনের ভাবনা আর শিল্প ভাবনার উপকরণ একই রকম। সেই রং আর তুলি। শব্দ আর কলম। যেভাবে আঁকা যায় সেই ভাবেই রাঙিয়ে দেওয়া যায়। আমাদের কত ভাবনা মাথায় আসে, সবকিছু না পেরেছি লিখতে, না পেরেছি কাউকে বলতে। না বলা কথাগুলো কখনো অক্ষরে গাঁথা গেল না। ভ্রমণের ভাবনাগুলো ছোট ছোট মেঘের মতো। কখনো আসে কখনো চলে যায়। কিন্তু ছোটবেলার ভ্রমণ কখনো শিশু মন থেকে হারিয়ে যায় না।বাবা কেন আপিসে যায়, যায় না নতুন দেশে? এই অমোঘ লাইনটি বারবার মনে হয়েছে আমাদের।


ভ্রমণের ব্যাপারে আমার মেজ মামা ছিলেন খুব করিৎকর্মা। মামার বাড়ির উদ্যোগেই ছিল আমার প্রথম ভ্রমণ যাত্রা । মামা,মামিমা, দাদু, দিদা এবং মামাতো ভাইরা মিলে একটা বিরাট টিম। সেই ভ্রমণে বাবা ছিলেন না। কী কারণে বাবা যাননি আমার মনে নেই ।তবে বাবা আমায় জুতো,জামা, সোয়েটার কিনে দিয়েছিলেন। বাবা স্টেশন অব্দি গিয়েছিলেন কিনা মনে নেই। আমাদের যাত্রা  হাওড়া না ব্যান্ডেল কোন স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠেছিলাম সেটাও মনে নেই।তবে মনে পরে হরিদ্বার স্টেশন থেকে বড় বড় হোল্ডডোল নিয়ে ঘোড়ার গাড়ি করে আমরা গিয়ে উঠেছিলাম ভোলাগিরি আশ্রমে ।

জীবনে প্রথম পাহাড় দেখলাম। উঁচু উঁচু জায়গা গুলোকে যে পাহাড় বলে এটা শুনেছিলাম। একটা ছবিও ছিল মনের ভেতরে। আমার মনের ছবির সঙ্গে কোনভাবেই তা মিলাতে পারছিনা। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার  ট্রেনে করে যাওয়ার সময় লিখেছিলেন, পাহাড়ে যাওয়ার সময় উড়ো সাপের মতো রেল যখন এক পাহাড় থেকে আর এক পাহাড়ে, এক মেঘ আর এক মেঘে আমাদের নিয়ে চলল সেই সময় পাশের একটা ছোট্ট ছেলেকে বললেম, পাহাড় কিরকম ভাবতিস? তার কথার পুঁজি কম, সে শুধু পর্বতের দিকে হাঁ করে চেয়ে বললে, পাহাড় যে এরকম তা একেবারেই মনে হত না। ছেলের মনের পাহাড়ে রূপটা ছিল একটা ঢিবি যার এপার ওপার দৌড়ে ওঠা নামা যায়, তাতে গাছ ছিল না,ঝরনা ছিলনা,পাথর ছিল না -- রূপের মরুভূমির মাঝে বালির স্তূপ, কিংবা একটা বড় গাছের গুড়ি -- তার বেশি একটুও নয়, ছেলের মনে আগের দেখা পাহাড় এবং পরের দেখা পাহাড়ে যে বিষম তফাত, ঠিক ততটাই তফাৎ চোখের দেখা থেকে বিচ্ছিন্ন অরূপ আর প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষ হচ্ছে যে রূপ তার মধ্যে।

 মনে আছে মেজ মামা বলেছিল হ্যাঁ রে তোরা হেঁটে উঠতে পারবি তো পাহাড়ে ? আমি কিছু না বুঝেই বলেছিলাম মনে হয় হ্যাঁ। সময়টা আমার মনে নেই  , তবে শীত ছিল হরিদ্বারে। সে-বয়সে আমাদের ফুল প্যান্ট পড়ার যোগ্যতা ছিলনা আর তেমন প্রচলনও ছিল না। মনে আছে মা জুতো মোজা পরিয়ে দিয়েছিল। হাফপ্যান্ট একটু বড় ছিল বলে মা কোমরে একটা দড়ি বেঁধে দিতেন। আমরা যাচ্ছি মনসা পাহাড়ে । নতুন জুতোয় পায়ে পড়লো ফোস্কা । জুতো সামলাতে গিয়ে কখন যে কোমর থেকে দড়িটা পড়ে গেছে সেটা আমার আর খেয়াল নেই। একহাতে জুতো আর এক হাত দিয়ে কোন রকমে প্যান্টটাকে ধরে রেখে দিয়েছি । প্যান্টটা মাঝে মাঝে ফুলপ্যান্ট হয়ে যাচ্ছিল। বড় হয়ে মামার বাড়িতে এই গল্প আমি অনেকবার শুনেছি। সে নিয়ে কত হাসাহাসি হয়েছে । মনে পড়ে পুরো রাস্তাটাই আমাকে সামাল দিয়েছিল বড় মাইমা। মা ,মেজ মাইমা এবং দাদাদের  সাথে আগেই পৌঁছে গিয়েছিল মনসা পাহাড়ের মাথায়।


দুপুর হলেই আমার মায়ের হাতে মার খাবার সময় হয়ে যেতো । আমায় নিয়ে যাওয়া হতো হরিদ্বারে গঙ্গায় । কনকনে ঠান্ডা জলকে আমি অসম্ভব ভয় পেতাম । সেই জলে আমায় সাবান মাখিয়ে স্নান করানো হতো । বলি দেবার আগে ছাগল(পাঁঠা ) গুলো যেমন আর্তনাদ করে ঠিক সে ভাবেই আমি কাঁদতাম । স্নানের যে কত মহিমা সে বয়সে ভালোই বুঝছি । স্নান করার পর একটা আনন্দ থাকতো সেটা হচ্ছে  কিছুটা ফ্রি সময় । ৫২ বছর আগে কোথায় খেতাম মনে নেই । তবে এই খাবার খেতে নেমে যেতাম রাস্তায়, দাদা বৌদির হোটেলটাই মনে হয় খেতাম।দাদা বৌদির হোটেলের যেখানে ঠিক তার পাশেই একটা ঘর ছিল। সেই ঘরের বাইরে বাধা থাকতো দুটো হরিণ । এদের নিয়েই আমার সময় কেটে যেতো। চোখের সামনে গঙ্গা দেখা যায় আর তার পেছনে পাহাড় । ওটা চণ্ডীপাহাড়,মেজমামা বলে দিয়েছে ওখানে নাকি ডাকাতরা থাকে! ওখানে আমাদের যাওয়া  নিষেধ। ওই পাহাড়ে থাকা তেনাদের ভয় দেখিয়ে আমাদের খাওয়ানো হতো । একদিন সকালে কী বিকেলে আমার মনে নেই , যাওয়া হবে ঋষিকেশ । সবাই রেডি ।  জুতো পড়াতে গিয়ে মা আর মোজা খুঁজে পাচ্ছে না । সমস্ত দোষ আমার !আমিই নাকি মোজা হারিয়ে ফেলেছি । তারপর দেখা গেলো কোন একজনেরও( বড় মামা বা মেজ মামা) মোজা পাওয়া যাচ্ছে না । মোজা হারানোর তাণ্ডবে সেদিন আমার আর সাদা ঘোড়ায় চাপা হলো না । কয়েক দিনের মধ্যে আরো দুজনের মোজা হারিয়ে গেলো । মোজা হারানো যেন একটা রহস্য-রোমাঞ্চ গল্পে পরিণত হল । মোজা হারানোর রহস্য নিয়ে সকলেই বেশ উত্তেজিত। নানা গল্পের রং মিশে যেতো। শেষপর্যন্ত মেজো মামার গোয়েন্দাগিরিতে ধরা পরল মোজা হারানোর গল্প ।


প্রতিদিন রাত্রিবেলা একটি ইঁদুর ঘরের কোণের নর্দমার গর্ত থেকে বের হয়ে মোজা মুখে করে নিয়ে  গর্তের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখত। সেই গর্ত থেকে মেজো মামা সকলের মেজো উদ্ধার করলেন।

ভোলাগিরি আশ্রম এর সামনে দাঁড়িয়ে থাকত ঘোড়ার গাড়ি। সে সময় হরিদ্বার ভ্রমণ ও ঋষিকেশ ভ্রমণের জন্য ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করা হতো। যাওয়া হতো ঘোড়াগাড়ি করেই  । একটা সাদা ঘোড়া ছিল সেই গাড়িটিকে টানতো।আমার প্রিয় গাড়ি। সেটায় চেপে আমায় যেতে হবে । বড় মামীমা আমায় কোলে করে সেই গাড়িতে উঠিয়ে দিতো । মা দিদি থাকত অন্য গাড়িতে ।

কয়েকটা স্মৃতি আমায় বারবার টেনেেছ । মনে পড়ে হরিদ্বার স্টেশনে নেমে দেখেছিলাম শিবের মাথায় জল পড়ছে ।প্রথম দেখা পাহাড় আমার প্রথম প্রেমে পরা। আর ঋষিকেশ গিয়ে লছমনঝুলার ওই যে দুলুনি সে আমি এখনোও ভুলতে পারিনি। কি একটা অসীম ভালোবাসা ছিল সেই ভ্রমণে। কৈশোরে ছোট খাটো কত ভ্রমণ করেছি,কিন্তু হরিদ্বারের  সেই ছবি হলুদ বিবর্ণ হয়ে গেছে জায়গায় জায়গায়। দাগ পড়ে গেছে তবুও সে ছবি যেন আমার মাথায় সব সময় ঘোরে । হরিদ্বার থেকে আমরা ট্রেনে করে দেরাদুন গিয়েছিলাম। ট্রেনের জানলার সামনে আমি দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম যে ট্রেনটা জঙ্গলের মধ্যে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। সেই হারিয়ে যাওয়ার স্বপ্নটা আমি মাঝে মাঝেই দেখি। সেই স্বপ্নে থাকতো আমার মুসৌরি। মুসৌরি পাহাড়ে কি ভাবে গিয়েছিলাম আমার মনে নেই। শুধু মনে আছে মা আমাকে লাল টিব্বা বলে একটা পাহাড়ে নিয়ে গিয়েছিল।

দেরাদুন থেকে  আমরা গিয়েছিলাম বেনারস। অনেক চেষ্টা করেও আমি কোনদিন মনে করতে পারিনি বেনারসের ছবি । শুধু মনে আছে পাড়েরের ধর্মশালায় আমরা ছিলাম।আর সেই বিখ্যাত গঙ্গাস্নান। এই ঠান্ডা জল। সেই সাবান। এটা এখনো আমার কাছে দুঃস্বপ্ন। বেনারসে বড় বয়সে অনেক বার গেছি। অনেক চেষ্টা করেছি পুরনো স্মৃতিকে মনে করবার। কিন্তু কিছুই মনে পড়েনি।

 বিশ্বাস হয়তো হবে না তবু একটা কথা বলি হরিদ্বারের স্বপ্ন আমার মাথায় এমন গেঁথে গিয়েছিলো যে একদিন ব্যান্ডেল থেকে ট্রেন ধরে জেনারেল কম্পার্টমেন্টে টিকিট না কেটে  হরিদ্বারে পৌঁছে গিয়েছিলাম । হরিদ্বারে পা রাখার পর আমার নির্ঝরের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছিল। সেই হরিণ,সেই সাদা ঘোড়া আমার স্বপ্ন রয়ে গেল।

@ প্রতিটি ছবি নেট থেকে নেওয়া।

মন্তব্যসমূহ

  1. Eto sundor barnona. Sab kichhu chokher samne dekhte pelam. 52 bachhor ager haridwar amar chokher samne uposthit. Ovibhuto.👌👌

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা গ্রহণ করবেন

      মুছুন
    2. খুবই ভালো লাগলো, nostalgic হয়ে যেতে হয় এই রকম লেখা পড়লে।

      মুছুন
  2. কত অল্পে সন্তুষ্টি আসতো। ছোট বেলার স্মৃতি.... সত্যি ভোলার নয়। খুব ভালো।

    উত্তরমুছুন
  3. খুব সুন্দর লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  4. Nice verynice ekti asdhran lekha. Lekhar bhetore ami thklam

    উত্তরমুছুন
  5. Chotobelar smriti kintu anobadyo hoyeche

    উত্তরমুছুন
  6. পড়ার ভেতরে একটা আনন্দ থাকে। এই আনন্দটাকে সকলের সাথে ভাগ করে নেয়াটা একটা বড় শিল্প

    উত্তরমুছুন
  7. আপনার মতন আমার ও ঐ সময়কালে প্রথম হরিদ্বার ভ্রমণ,বাদর খেলা দেখতে গিয়ে,হারিয়ে যাওয়া বাবা হাতে প্রচন্ড চড় খাওয়া।আর মনে পড়ে বড় বড় লাল লাল মাছকে মুড়ি না কি খাওয়া নো.......

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. আমার মনে হয়েছে মাছের কথাটা লেখা হয়নি। আপনি খুব ভালোভাবে মনে করিয়ে দিলেন। আমারও মনে পড়ছে লাল লাল মাছের কথা।

      মুছুন
  8. লেখা পড়ে মনে হচ্ছিল আরও একটু পড়ি। দাদা আপনার লেখা তে যাদু আছে।

    উত্তরমুছুন
  9. অনেক অনেক ভালোবাসা আর শুভেচ্ছা জানাই।

    উত্তরমুছুন
  10. স্মৃতি বড্ড বেদনা দাযক ।হিসাব মেলানো কঠিন ।

    উত্তরমুছুন
  11. খুব ভালো লাগলো। চোখের সামনে যেন একটা চলচ্চিত্র ভেসে উঠল।সেই সঙ্গে অনেক কিছু জানতে পেরে সমৃদ্ধ হলাম।

    উত্তরমুছুন
  12. খুব সুন্দর বর্ণণা দাদা

    উত্তরমুছুন
  13. সব মনের কোনায় জমা করে রেখে দিয়েছ ,দারুণ একটা অনুভূতি

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. হ্যাঁ ভালোলাগা গুলো ভালোলাগাই থেকে যায়

      মুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মধেরার সূর্য মন্দির

মিশর ভ্রমণের নান্দীমুখ।

হালিশহর এক দিনের ভ্রমণ।