লাদাখ দর্শন

 লাদাখ দর্শন 

বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায়।

প্রথমে ভেবেছিলাম লাদাখ নিয়ে কোন শব্দই খরচ করব না। দু একটা ছবি আমি মোবাইলে তুলেছিলাম। সেগুলোই পোস্ট করব। কিছু ভালোবাসার মানুষ আছেন তাদের অনুরোধকে অবহেলা করতে পারলাম না। কিভাবে কি চোখে আমি লাদাখকে দেখলাম সেটা জানতে চাইছেন অনেকেই। কি দেখলাম সেটা বড় কথা নয়, কি ভাবে আমি লাদাখকে দেখাবো সেটা বড় কথা। আমার ভ্রমণ ছিল শ্রীনগর কারগিল হয়ে লেহ। সত্যি কথা যদি আমি বলি তাহলে অনেকেই রে রে করে উঠবেন। ভালো লাগা আর খারাপ লাগাটা খুবই আপেক্ষিক। আজ যা আমার খুব খারাপ লেগেছে। পরবর্তী সময়ে হয়তো আমার সেটা খুবই ভালো লাগবে। এতদিন আমরা হিমালয়ের সামনেটা দেখেছি। হিমালয়ের পিছনের অংশটা লাদাখ।প্রতিমার পেছনটা তো আমরা দেখিনি। প্রতিমার পেছনটা কখনোই আমার কাছে খুব সুন্দর হয়ে ওঠে না। রুক্ষতার সৌন্দর্য উপলব্ধি করা যায়। তাকে সামনে থেকে দেখা যায়। কিন্তু রুক্ষতাকে বেশিদিন বুকে চেপে ধরে রাখা যায় না।

বৌদ্ধ সংস্কৃতি আমার ভালো লাগে। কিন্তু লাদাখের বৌদ্ধ সংস্কৃতি বেশ কঠিন সংস্কৃতি। পর্যটকদের পূর্বাঞ্চলের দিকে বেশি ঝোঁক কেননা এই অঞ্চলে বৌদ্ধদের নিদর্শন বেশি এবং সেগুলো সরাসরি তিব্বতি বৌদ্ধ সংস্কৃতির সাথে সর্ম্পকিত। তিব্বতের বৌদ্ধ সংস্কৃতির সাথে ভারতীয় বৌদ্ধ সংস্কৃতির অনেক পার্থক্য। আমরা যারা ভ্রমণ করি সব সময় খোঁজার চেষ্টা করি সেই অঞ্চলে আমি আছি কি না। যার জন্য দেখবেন আমিকে খুঁজে পাবার জন্য কেদারনাথ মন্দিরে ভিড় বেশি। তিব্বতী সংস্কৃতি দ্বারা লাদাখ প্রচন্ডভাবে প্রভাবিত বলে এই অঞ্চলকে ক্ষুদ্র তিব্বত বলা হয়ে থাকে।

নবম শতাব্দীর সময় লাদাখে রাজত্বের জন্মের আগে লাদাখ সম্পর্কে তথ্য খুবই কম। ৯৫০ খ্রিস্টাব্দে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার আগে স্বতন্ত্র ভূখণ্ড হিসেবে লাদাখকে আদৌ বিবেচনা করা হতো বলে জানা যায়নি। প্রাথমিকভাবে তিব্বতীয় সাম্রাজ্যের পতনের পরে সীমান্ত অঞ্চলগুলি স্বাধীন শাসকদের অধীনে
স্বাধীন রাজ্য হয়ে ওঠে, যাদের বেশিরভাগ তিব্বত
রাজপরিবারের শাখা থেকে এসেছিল।

দুই নদীর সঙ্গম

পদ্মসম্ভব শুধুমাত্র একজন মহাপণ্ডিত ছিলেন না। অতিশয় কষ্ট সহিষ্ণু পর্যটক। বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য অশোক লাদাখের পথে বহু মানুষকে পাঠিয়েছিলেন। যুদ্ধ হানাহানির মাঝে বৌদ্ধধর্ম কোথাও যেন একটুখানি হলেও হারিয়ে গিয়েছিল। পদ্মসম্ভব ৭৫০থেকে ৮০০ খ্রিষ্টাব্দ এই সময় হিমালয়ের পথে বিশেষ করে লাদাখের পথে বৌদ্ধ ধর্মকে আবার পুনঃ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
দুটি কারণে লাদাখ বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে। প্রথম কারণটি হল লাদাখের একপাশে চিন সীমান্ত অন্যপাশে পাকিস্তান সীমান্ত। প্রতিরক্ষার কারণে লাদাখকে খুবই যত্ন করতে হয়। ৪৭ সালে পাকিস্তান আক্রমণ করে। ৬২ তে চীনা আক্রমণ ৯৯ সালে আবার পাকিস্তান আক্রমণ। দ্বিতীয় কারণটা হলো মধ্যযুগীয় বৌদ্ধ সংস্কৃতি এখনো ধরে রাখার চেষ্টা। লাদাখে গিয়ে আমি দেখেছি বহু মানুষ হেমিংস গুম্ফার সামনে এসেও না দেখেই তারা ফিরে এসেছেন। শুধু হেমিংস নয়, অনেক সুন্দর সুন্দর বৌদ্ধমঠ দেখার জন্য ভেতর থেকে টান অনুভব করেননি। এক উচ্চতাজনিত সমস্যা। দ্বিতীয়ত বৌদ্ধ সংস্কৃতির সাথে পরিচয় না থাকার জন্য।

বৌদ্ধ স্তুপা

লাদাখের পথে যে সমস্ত নদীগুলো পড়ে তার মধ্যে আছে সিন্ধু,সুরু, জাংস্কার, নুব্রা ইত্যাদি। সিন্ধু ছাড়া কোন নদীর সাথে আমাদের সংস্কৃতির খুব একটা মিল নেই। নতুন সংস্কৃতির সাথে মিল না থাকলে তাকে কি আমরা দেখতে যেতে পারি না? দেখতে যেতে অবশ্যই পারি। কিন্তু ভেতর থেকে টান অনুভব করি না। চাঁদের পাহাড়, নানা রঙের পাহাড়, কাদার পাহাড়, চুম্বক পাহাড়, কত রকম নীল আকাশ এই সব দেখার আনন্দ আছে। প্রতিটা মুহূর্ত একটা শুষ্কতা, ভয়ংকর এক স্তব্ধতা বুকের ভেতরে চেপে বসে। দেখতে দেখতে চোখের আরামবোধ নষ্ট হয়ে যায়। চোখ যদি ক্লান্ত হয়ে যায় তখনই শরীর খারাপ হতে শুরু করে। প্রতিটি পথই দীর্ঘ। এই দীর্ঘ পথের মধ্যে মানুষ নেই। মানুষের রং নেই,মরুভূমিতে আবার মানুষ কোথায়? কেন মানুষ নেই? রাজস্থানের মরুভূমিতে যখন দুটি বা তিনটি নারী বালিয়াড়ির উপর দিয়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ান তার সৌন্দর্য কিভাবে প্রকাশ করব আমরা! লাদাখের পাহাড় বৃক্ষহীন, মাটিতে বালির ভাগ বেশি। নীল আকাশ আছে। আকাশে মেঘের সংখ্যা কম। মানুষ আছেন, তবে সেই সব মানুষদের সাথে পরিচিত হওয়ার জায়গা বড়ই কম । বৌদ্ধ সংস্কৃতির সাথে জড়িত থাকলেও অতিথি দেব ভব শব্দটির সাথে লাদাখের মানুষের পরিচয় বড় কম।
হিমালয় কে দেখার জন্য মানুষ পায়ে হেঁটে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেরিয়েছেন। এখানে আমরা হিমালয়ের পিছন দিকটা দেখবার জন্য গাড়ি করে প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত যেতেই প্রানোষ্ঠাগত হয়ে উঠছে। চাঁদের পাহাড় কেমন দেখতে আমি জানিনা। সবাই বলেন এরকমই নাকি চাঁদের পাহাড় দেখতে। পাহাড়ি রংয়ের বাহার। সত্যি কথা বলতে কি খারদুংলা পাসে দাঁড়িয়ে ভগবানের সাথে কথা বলার মানসিকতা টাও হারিয়ে যায়। এতো কঠিন পথের মাঝে নিজেকে মেলে ধরা বড় কঠিন। কুমারটুলিতে প্রতিমা তৈরি করার আগে শুষ্ক বিচুলি দিয়ে কাঠামোর উপর পরিকাঠামো তৈরি করা হয়। মাটির প্রলেপ দেয়া হয়। লাদাখকে এসে আমি শুধু কাঠামো ও পরিকাঠামোই দেখেছি,প্রতিমার গায়ের রং দেখেছি, কিন্তু প্রাণ দেখিনি।

মূল বেকের রাস্তায়

মন্তব্যসমূহ

  1. অজানা কে জানলাম আমার খুব ভাল লাগলো

    উত্তরমুছুন
  2. would love to visit, though your writing takes a trip

    উত্তরমুছুন
  3. Akdam anyo perspective a likhechhen , anekangsei samorthon kori, tabey etaoto thik গভীর নীল আকাশের নিচে লাদাখ ধ্যানস্থ এক ঋষী। Santa kundu।😊😊

    উত্তরমুছুন
  4. অজানা কে জানলাম তবে ছননছারা ভাব।

    উত্তরমুছুন
  5. লেখাটা তো পড়লাম। এই বার নিজের চোখে দেখতে চাই।

    উত্তরমুছুন
  6. রুক্ষ সৌন্দর্য্যের অনুভূতি.......

    উত্তরমুছুন
  7. সুন্দর লেখা। লাদাখ নিয়ে আর একটু লিখলে ভালো লাগত।

    উত্তরমুছুন
  8. সবাইকে জানাই আমার আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মধেরার সূর্য মন্দির

মিশর ভ্রমণের নান্দীমুখ।

হালিশহর এক দিনের ভ্রমণ।