ময়নামতি

 ময়নামতি

বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায়

আমরা যখন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার দিকে যাচ্ছি, সেই সময়  ময়নামতির নামটা উচ্চারণ হয়েছিল। আমাদের এক সঙ্গী  বললেন ময়নামতি নামটার সাথে বাঙালির রোমান্টিকতা বহুদিনের। ময়নামতির চর দেখার ইচ্ছে বা বাসনা  আমারও ভেতরে ভেতরে সুপ্ত হয়ে ছিল।চালক বললেন, ময়নামতি যাবেন? আমরা এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম। ময়নামতিতে কি দেখার আছে আমরা নিজেরাও জানিনা। আমাদের চালক সেভাবে কিছু বললেন না। ঢাকা-চট্টগ্রামে হাইরোড থেকে বাঁদিকে আমাদের গাড়িটা ঢুকিয়ে দিলেন। গ্রামের ভেতর দিয়ে ভেতর দিয়ে যাচ্ছি  ময়নামতি দেখতে।  একটা উৎকণ্ঠা কাজ করছে।কি দেখবো সেখানে গিয়ে? ময়নামতির চর না তেপান্তরের মাঠ? কি দেখতে যাচ্ছি?


 কুমিল্লা। গোমতী পাড়ের শহর। ত্রিপুরার রাজারা এক সময় এ শহরের গোড়াপত্তন করেছিলেন গ্রীষ্মকালীন অবকাশযাপন কেন্দ্র হিসেবে। গোমতী পার বলে এ জনপদের সুখ্যাতি রয়েছে। নদী ও পুকুর শহর কুমিল্লা। তার পাশঘেঁষে গড়ে উঠেছে কমলাংক বা বর্তমান কুমিল্লা। বাংলাদেশ আয়তনে একটি দেশ হলেও পর্যটনশিল্পের বিচিত্র শাখায় সমৃদ্ধ এই জেলা। বিরল সৌন্দর্য ও সভ্যতার আদি নিদর্শন এ অঞ্চলের মানুষের বর্ণাঢ্য জীবনধারা প্রকৃতির এ রূপ দেশি-বিদেশি ভ্রমণবিলাসীদের চিরকাল আকর্ষণ করেছে। কুমিল্লা শহরের বুকজুড়ে রয়েছে আদি নিদর্শন শালবন বিহার, রূপবানমুড়া, ইটাখোলামুড়া, ময়নামতি ঢিবি, রানির বাংলো, ময়নামতি জাদুঘর আরো আছে অপূর্ব প্রাকৃতিক ঘেরা সবুজ বৃক্ষবেষ্টিত লাল মাটির লালমাই পাহাড়।প্রাচীন সভ্যতার নীরব সাক্ষী ময়নামতি লালমাই।

কুমিল্লা শহর থেকে আট কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত।কালিবাজার সড়ক ধরে কুমিল্লা শহর থেকে কোটবাড়ি এসে দক্ষিণ দিকগামী রাস্তা দিয়ে ১.৫ কিলোমিটার এগিয়ে গেলে শালমানপুর গ্রামে পৌঁছানো পর হাতের বামে শ্রী ভবদেব মহাবিহার। কালের পরিক্রমায় গ্রামের নামানুসারে শালবন বিহার নামকরণ হয়।



 টিলাগুলোর উত্তর অংশে ময়নামতি, দক্ষিণে লালমাই মাটির রং লাল ও টিলাগুলো ঢালু। ১৮৭৫ সালের আগ পর্যন্ত সব ছিল অজানা। বর্তমান কোটবাড়ি এলাকার রাস্তা তৈরির সময় ছোট ইমারতের ধ্বংসাবশেষে উন্মোচিত হয়ে পড়ে। ভূমির ওপর অসংখ্য কাঠের ফসিলের টুকরো দেখতে পাওয়া যায়, যা ভূমন্ডলীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। ১৯১৭ সালে অধ্যক্ষ নলিনী কান্ত ভট্টশালী রনবংকমল¬ হরিকেল দেবের তা (খ্রিস্টীয় তেরো শতক) উল্লেখিত দুর্গ বিহার পরিবেষ্টিত পট্টিকরা নগর বলে শনাক্ত করেন। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ও জরিপের ফলে মূল্যবান স্থাপত্যএর নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়।

 গাড়ি একটা শাল জঙ্গলে কাছে এসে থেমে গেল। না আমরা ময়নামতির চরে আসেনি। এসেছি পুরনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ বিশ্ববিদ্যালয় এক বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়। বিক্রমশিলার বিশ্ববিদ্যালয়ে সম সাময়িক। এ তো মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি! বাংলাদেশের পাহাড়পুরে বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় একবার খুব ইচ্ছে ছিল,সেটা দেখার আমার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু ময়নামতিতে যে এরকম একটা পুরনো বিশ্ববিদ্যালয় আছে তা আমার জানা ছিল না।


বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় গুলো  সব সময়  একটু উঁচু জায়গায় হত। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় হোক  বা বিক্রমশিলা বিশ্ববিদ্যালয় হোক, সকলেরই অবস্থান  নদীগর্ভ থেকে  অনেকটা উঁচু জায়গায়।

জনাকীর্ণ কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় আট মাইল দূরে  ময়নামতি । নিচু পাহাড়ি এলাকাকে এই নামেই ডাকা হয়। মেঘনা অববাহিকার বিস্তীর্ণ উর্বর নিচু সমতল ভূমির মধ্যে এই উঁচু অঞ্চল। একসময় ছিল ঘন অরণ্যে ঢাকা। বিখ্যাত ছিল দুর্লভ ঔষধির জন্য। প্রাচীন রাজারা একে বলতেন ‘লালম্বি বন’। এখানকার ভূপ্রকৃতিও ঠিক পাললিক নয়। মাটি লালচে। একসময় এখানে ছিল শালের বন।

ময়নামতি বাংলাদেশের কুমিল্লায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক স্থান। ময়নামতির আগে এই জায়গার নাম ছিল রোহিতগিরি। আবিষ্কৃত লালমাই অঞ্চলের প্রাচীনতম সভ্যতার নিদর্শন হল ময়নামতি প্রত্নস্থল। বর্তমানে ময়নামতি অঞ্চলে যে ধ্বংসস্তূপ দেখা যায় তা প্রকৃতপক্ষে একটি প্রাচীন নগরী ও বৌদ্ধ বিহারের অবশিষ্টাংশ। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে জয়কর্মান্তবসাক নামক একটি প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ। আমরা এসেছি সেই প্রাচীন নগরী ও বৌদ্ধ বিহারের প্রত্নস্থল দেখতে।



আমাদের গাড়িটা যেখানে থামলো সেটা একটা শালবনের জঙ্গল। এই জঙ্গলটা বাংলাদেশের মানুষের কাছে  সুন্দর একটা পিকনিক স্পট। বিভিন্ন জেলা থেকে স্কুলের বাচ্চারা বনভোজনের সঙ্গে দেখে নিচ্ছেন ঐতিহাসিক স্থলটিকে।

এখানকার অনেক বিহারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিত শালবন বিহার। ময়নামতি অঞ্চলে গেলে অধিকাংশ মানুষ এটাই দেখতে যায় প্রথম। সপ্তম শতাব্দীর এই বৌদ্ধবিহারে ছাত্ররা পড়ালেখা করেছে ১৩০০ সাল পর্যন্ত। এটি ছিল আবাসিক শিক্ষায়তন। শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য ছিল ১১৫টি কক্ষ। এর আসল নাম ছিল ভবদেব বিহার।

ময়নামতিতে খননকৃত সব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে শালবন বিহার অন্যতম প্রধান। কোটবাড়িতে বার্ডের কাছে লালমাই পাহাড়ের মাঝামাঝি এলাকায় এ বিহারটির অবস্থান। বিহারটির আশপাশে এক সময় শাল-গজারির ঘন বন ছিল বলে  বিহারটির নামকরণ হয়েছিল শালবন বিহার। এর পাশের গ্রামটির নাম শালবনপুর। এখনো ছোট একটি বন আছে সেখানে। বিহারটি পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের মতো হলেও আকারে ছোট।এ রকম বিহার কুমিল্লার ময়নামতি অঞ্চলে ছিল একাধিক। তার সামান্য অংশই খনন করা হয়েছে। বিশাল অংশ রয়ে গেছে মাটির তলায়। যা এর মধ্যে খনন করে লোকচক্ষুর সামনে আনা হয়েছে, সেগুলোও অনেক—কোটিলা মুড়া, চারপত্র মুড়া, ভোজ বিহার, রূপবান মুড়া, ইটাখোলা মুড়া ইত্যাদি।

 কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে প্রবেশ করলাম। অনেকটা কাশ্মীরের বিভিন্ন বাগানের মত  সাজানো। বিভিন্ন ফুলের গাছ বিভিন্ন পাতাবাহারি গাছের সাথে জায়গাটা মিলেমিশে অরূপ সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে। মূল খননকার্য জায়গাটি পৌঁছতে বেশ কিছুটা হাঁটতে হয়। হাঁটতে খুবই ভালো লাগছিল। সামান্য ঠান্ডা। মাথার ওপরে রোদ।

বিহারের ভেতর প্রবেশের জন্য উত্তর বাহুর মাঝখানে একটি তোরণ আছে। খোলা চত্বরের মাঝখানে বিহারের তোরণের সিঁড়ি থেকে দক্ষিণে কেন্দ্রীয় মন্দিরের অবস্থান। মন্দিরটি ক্রুসাকার ভূমি পরিকল্পনায় নির্মিত। এই মন্দির পরিকল্পনাকে ইন্দোনেশিয়ার জাভায় অবস্থিত কলসন মন্দির (৭৭৮ খ্রি.), মিয়ানমার প্যাগানের আনন্দ মন্দির (১০৯০ খ্রি.) এবং বাংলাদেশের সোমপুর বিহার, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের স্থাপত্যকলার উৎস সূত্র হিসেবে গণ্য করা যায়। প্রদক্ষিণ পথের সঙ্গে খামওয়ালা হলঘর সিঁড়ি গলিপথ ভোজনালয় এবং ভোজনালয় কোটাটিতে কুলিঙ্গসহ আসনের সংস্থান আজও অক্ষত রয়েছে। হলঘরের দক্ষিণে মূর্তি কোটার অবস্থান এবং রাখার জন্য বেদিও ছিল। চারপাশে রয়েছে প্রদক্ষিণ পথ। কালের পরিক্রমায় মন্দিরের পরিসর কমে আসে। উল্লেখ্য, প্রত্যেক আমলে মন্দিরে ঢোকার জন্য উত্তর দিক থেকে সিঁড়ি ব্যবস্থা এবং চারপাশে ঘেরার উপযোগী পথের অস্তিত্ব ছিল বলে অনুমান করা যায়।


 বাংলাদেশের নিস্বতা আছে,বাংলাদেশির যে অঞ্চলে  ভ্রমণ করতে গেছি, এখানে দেখেছি পুরুষ হোক আর মহিলা হোক  সকলেই একই  রকম পোশাক পড়ে ভ্রমণ করেন। ময়নামতিতে এসে দেখলাম, একই রকম পোশাক পরে বহু মানুষ এসেছেন প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে। শুধু তাই নয়, স্কুলের ছেলেমেয়েরাও অতি উৎসাহের সঙ্গে প্রাচীন খননকার্য দেখছিলেন। যারা বাংলাদেশ ভ্রমণে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম রাখেন তারা অবশ্যই একবার ময়নামতি ঘুরে আসবেন।

মন্তব্যসমূহ

  1. বাংলাদেশ আমার বড়োই ভালো লেগেছে। আবারো যাবো।আর অবশ্যই ময়নামতির তীরে যাবো।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. সদ্য বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষ। আশা করি তার ভালো লেগেছে

      মুছুন
  2. অজানা কে জানলাম। খুব ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  3. অপূর্ব বর্ণানায় দেখা জিনিস আর একবার দেখলাম। ❤️

    উত্তরমুছুন
  4. খুব সুন্দর লিখেছেন।

    উত্তরমুছুন
  5. পড়ে ভালো লাগল।আমার বেশ আপশোষ আছে বোর্ড দেখেছি ময়নামতীর অথচ যাবার সময় ছিল না ভ্রমণ সাথীও ভালো ছিল না।আপনার চোখ দিয়ে দেখে নিলাম।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই আপনাকেঅনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে

      মুছুন
  6. অজানা কে জানলাম।ভালোলাগল।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. আপনি আমার সব লেখা পড়েন তার জন্য অনেক অনেক শুভেচ্ছা জানাই

      মুছুন
  7. বাংলাদেশ যাবার ইচ্ছা আছে।গেলে অবশ্যই ময়নামতি ঘুরে আসব।

    উত্তরমুছুন
  8. কত অজানাকে জানা গেল।

    উত্তরমুছুন
  9. খুব ভালো লাগলো ।বাংলাদেশ গিয়েছিলাম ময়নাতদন্ত দেখা
    হয়নি ।এবার গেলে দেখে নিতে
    হবে ।যদিও ছবির মতো সুন্দর
    লেখা ।ভালো থেকো শুভ কামনা রইলো মৈত্রেয়ী দি
    ময়না মতি তদন্ত নয়।

    উত্তরমুছুন
  10. ময়নামতির বৌদ্ধ বিহার এর ধ্বংসাবশেষ অঞ্চল না দেখলেও আমি কিন্ত ময়নামতি মিউজিয়াম দেখেছিলাম, সেখানেই ঐ খনখননকার্যের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেছিলাম,অনেকটা দুধের স্বাদ ঘোলা মেটানোর মত। এটা বাংলাদেশের গর্ব ।
    ,, শিব সৌম্য বিশ্বাস, হালিশহর।

    উত্তরমুছুন
  11. খুব ভালো লাগলো -বিপাশ কুরি

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মধেরার সূর্য মন্দির

মিশর ভ্রমণের নান্দীমুখ।

হালিশহর এক দিনের ভ্রমণ।