কম্বোডিয়ার আঙ্কোরভাট মন্দির
কম্বোডিয়ার আঙ্কোরভাট মন্দির
বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায়
কলকাতা থেকে ব্যাংকক হয়ে যাচ্ছি সিয়েমরিয়েপ। কোথায় যাচ্ছি? যাচ্ছি কম্বোডিয়া। কি করতে না, আঙ্কোরভাট মন্দির দেখতে! বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হিন্দু মন্দির। এই মন্দিরটি দেখার জন্য আমার যে খুব একটা উৎসাহ ছিল তেমন নয়। যাবার সময় ভেবেছিলাম সবাই তো যায় আমিও একবার যাই। শুধুমাত্র একটা মন্দির দেখার জন্য এতদূর আশা? ভেবে অবাকই লাগছিল ভেতরে ভেতরে। তবে হ্যাঁ, যাওয়ার আগে একটু পড়াশুনা করেছিলাম।সেটা যতটা না নিজের জন্য অন্যের জন্য পড়তে হয়েছিল।
সিয়েমরিয়েপ বিমানবন্দরে নেমে একটু অবাকই হলাম। জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ এতটুকু ঠান্ডা নেই। হোটেল খুব একটা দূরে নয়। হোটেলে গিয়ে সামান্য বিশ্রাম নেওয়ার পরেই বেরিয়ে পড়লাম মন্দিরের শহর আঙ্কোরভাট দেখতে। বদ্ধ জলাশয়ের মধ্যে তো একটা ঘুর্নি ছিল মনের মধ্যে। মন্দিরের কাছাকাছি আসার পর প্রস্রবণের ধারা প্রবাহের একটা পথ খুঁজছিল। সেই পথটা দেখালেন একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। ভিতরে ভিতরে যে প্রবাহ ধারা বয়ে চলেছিল বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ওঙ্কার ভাটের শিল্পচেতনার কথা এমনভাবে আমাকে বললেন, সেখান থেকেই এক নতুন রূপ সুপ্ত চেতনায় জেগে উঠেছিল। তখন ভাবলাম না মন্দিরটা ভালো করেই দেখে যাব।
এত বিশাল এক শিল্পের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। কথা হারিয়ে যাছিল। একা একাই নিবিড় জঙ্গলের মধ্যে একটু অন্ধকার একটু ছায়া খোঁজবার চেষ্টা করছিলাম। মেরু পর্বতের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছি, পর্বতে উঠবো না কি গ্যালারিতে বসে থাকবো। আঙ্কোরভাট মন্দিরটি যখন তৈরি হয়েছিল খুব স্পষ্ট ভাবে একটা জিনিস সূচিত হয়ে আছে নির্মাণ কৌশলে। কৌশলের দু ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে একটা পদ্ধতি হল মাউন্টেন বা পাহাড়ি মন্দিরের ধাঁচ, অন্য টি হল গ্যালারি মন্দিরের ধাঁচ। আর সব মন্দিরের মুখ পশ্চিমমুখী। আমি একটা কোণ আবিষ্কার করলাম যেখান থেকে দাঁড়িয়ে দেখলাম মন্দিরটি একটা ত্রিভুজের মতো কোনাকুনি দাঁড়িয়ে আছে। সেই জায়গাটাতেই গাছের তলায় এসে বসলাম।
প্রথমে ঠিক করলাম পর্বত চূড়ায় উঠবো। দূর থেকে মন্দিরটা যে খুব সুন্দর দেখতে তা নয়। কালো কালো শ্যাওলার ছাপ তার সারা গায়ে। আমার মনে পড়ে সাঁওতাল পল্লীর সুন্দরী রমনীর কথা। আমায় দেখে ঘুমটা টানতে গিয়ে শরীরের কাপড়টি উদাস হয়ে গিয়েছিল। এখন এই উদাস আঙ্কোরভাট মন্দিরটি আমার কাছে সুন্দরের প্রতিমা। শিব হলেন সত্য ও সুন্দরের পূজারী। বহু যুগ আগে এই মন্দির তো শিবেরই ছিল। পরে হলো বিষ্ণুর।
কি অদ্ভুত ঘটনা শৈব মন্দির থেকে বিষ্ণু মন্দির। নাটকীয় পদ পরিবর্তন হয়েছে অনেকভাবে। উচ্চবিত্তদের আগ্রাসী মনোভাবে নিম্নবর্গের মানুষরা যখন কোন ঠাসা। সেই সময় প্রতিষ্ঠান বিরোধী সংগঠন আবার ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ের উচ্চ শীর্ষে গিয়ে পৌঁছে যান। প্রতিষ্ঠান বিরোধী নেতা তো গৌতম বুদ্ধ। রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের ফলশ্রুতিতে কম্বোডিয়ায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রচলন ঘটে। ফলে ১৪শ বা ১৫শ শতাব্দীতে আঙ্করভাট হিন্দু উপাসনা কেন্দ্র থেকে বৌদ্ধ মন্দিরে পরিণত হয়, যা আজ পর্যন্ত বজায় আছে। দক্ষিণ এশিয়ায় যে সমস্ত দেশে আমি গেছি তার মধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ বুদ্ধ ধর্মই তাদের প্রধান ধর্ম। সেই সব দেশে আবার গৌতম বুদ্ধের পাশাপাশি ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর দুজনের মূর্তি দেখা যায়। থাইল্যান্ডের পাশেই কম্বোডিয়া। বলা যেতে পারে থাইল্যান্ডের কিছু জমি কম্বোডিয়াতে চলে গেছে। তার বদলে এসেছে বৌদ্ধ ধর্ম। থাইল্যান্ডে গিয়েও দেখা যায় গৌতম বুদ্ধের পাশাপাশি,রামচন্দ্র আর ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর মূর্তি।
একটা বড় প্রশ্ন আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে। সকলেই বলেন, এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন রাজা দ্বিতীয় সূর্য বর্মন। তিনি ছিলেন আংকারের শক্তিশালী যোদ্ধা। যিনি ১২০০ শতাব্দীতে আংকারের রাজাকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেছিলেন। দ্বিতীয় সূর্য বর্মন তার রাজত্বকালে সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী সরকার গঠন করেছিলেন। সেই সময়কার তৈরি স্থাপত্য শিল্প গুলোই তার সমস্ত প্রতিপত্তির পরিচয় বহন করে চলেছে। বলা হয় মধ্যযুগীয় এই মন্দিরটির বিশ্ব ইতিহাসের সর্ববৃহৎ মন্দির। সেই হিসেবে মন্দিরটি বয়স খুব বেশি হলে ৮০০ বছরের পুরনো। এর চেয়েও পুরনো মন্দির স্থাপত্য কলা ভারতে আছে। আঙ্কার ভাট মন্দিরে যে ধরনের স্থাপত্য শৈলী,(পাথরের উপর যে ধরনের মূর্তির কাজ আছে ) ঠিক একই রকম কাজ আমি দেখেছি কাশ্মীরের অবন্তীপুরে। দুজন রাজাই ছিলেন কিন্তু বর্মন। একজন অবন্তীবর্মন অন্যজন হলেন সূর্যবর্মণ। অনেক মিল আমি খুঁজে পেয়েছি দুই মন্দিরের মধ্যে।অবন্তীপুরে ধ্বংসাবশেষে শিব ও বিষ্ণুকে উৎসর্গ করা দুটি মন্দির ছিল, এবং উৎপলা রাজবংশে রাজা অবন্তীবর্মনের অধীনে ৯ম শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল। দুই মন্দিরের একটা মিল খুব পরিষ্কার । দুটোই পশ্চিম মুখী মন্দির। কিন্তু প্রশ্ন হল, ৮০০ বছর আগে কি ডাইনোসরের ছিল? বিজ্ঞান বা ইতিহাস কোনটাই তো হ্যাঁ বলছে না। তাহলে আঙ্কোর ভাটের মন্দিরে গায়ে কি করে খোদাই করা হলো ডাইনোসরাসের মূর্তি?
তাহলে কি এই মন্দির তৈরির পেছনে কোন এলিয়েনদের হাত আছে?
যদি কেউ মনে করেন, একই দিনে আঙ্কোরভাট মন্দির আমি ঘুরে নেব তা হলে সেটা হবে আঙ্কোরভাট মন্দিরের মতোই বিস্ময়কর। যেখানে এসে আমাদের গাড়িটা থামল সেখান থেকে শুরু হচ্ছে আঙ্কোরভাট মন্দির। মূল মন্দিরের চত্বরে প্রবেশ করতে গেলে আপনাকে ছোট গাড়ি নিতে হবে। ওখানেও টোটো,অটোর মত গাড়ি পাওয়া যায়।
আমি হেঁটেই শুরু করলাম আমার যাত্রা। কিছুটা যাবার পর মনে হল এ যেন জঙ্গলে প্রবেশ করছি। ভাঙা পাঁচিলের ভেতর দিয়ে ঢুকতে হলো আমাদের। প্রবেশ দ্বার একটু দূরে। প্রবেশদ্বারের সামনের রয়েছে প্রাচীন একটি মন্দির। তার পাশ দিয়ে যেতে হবে। মন্দিরের এলাকা কত বড় সেটা একটু বলছি১৬২.৬ হেক্টর বা ৪০২ একর। এত বড় একটা মন্দির তৈরি করে খেমের রাজারা বিষ্ণুকে উৎসর্গ করলেন। মন্দিরের চারিপাশে পরিখা ও ৩.৬ কিমি পাঁচিল।
সাড়ে তিন কিলোমিটার ঘুরে মন্দির দেখা বড় কঠিন কাজ। এখন আমরা যাকে আঙ্কোরভাট মন্দির বলি সেই সময় রাজারা তার নাম দিয়েছিলেন ব্রহ্ম বিষ্ণুলোক বা
পরমা বিষ্ণুলোক। যার অর্থ বিষ্ণুর পবিত্র বাসস্থান। এটি হিন্দু পুরাণে নাকি বলা হয়েছে দেবতাদের আবাস মেরু পর্বতে,ঠিক তার আদলে গড়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ৫টি টাওয়ার মেরু পর্বতের ৫টি পর্বত শৃঙ্গের প্রতিনিধিত্ব করছে। দেয়াল ও পরিখা হল পর্বতমালা ও মহাসাগরের প্রতীক। মন্দিরের উচ্চতর অংশগুলিতে প্রবেশ ক্রমশ দুরুহ হয়েছে। মেরু পর্বতের অনুকরণে টাওয়ারে ওঠা খুব কঠিন। খাড়া সিঁড়ি। উঠতে বেশ কষ্ট হয়।
কষ্ট হলেও আমি উঠতে থাকি মন্দির দেখার জন্য। মূল মন্দির থেকে আরেকটি মন্দির যাওয়ার জন্য অনেকটা হাঁটতে হয়। মন্দিরের ভেতর দিয়েই মন্দিরে যাওয়া। একদিকে বড় বড় বুদ্ধমূর্তি। অন্যদিকে পাথরে খোদাই করা হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন কাহিনীকে রচনা করা।
আমাকে দেখতে হবে এই মন্দির ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি মন্দির যা ওঙ্কার ভাট মন্দির নামেই পরিচিত হয়ে আছে। যেতে হবে অ্যাংকর থোম।
১১৭৭ সালে অ্যাংকর শহরটি খমেরদের চিরাচরিত শত্রু চামদের হাতে পরাজিত ও লুণ্ঠিত হয়। এর পর নতুন রাজা ৭ম জয়বর্মণের আগমন ঘটে। তিনি রাজ্যটিকে পুনর্গঠিত করেন এবং অ্যাংকর ভাটের কয়েক কিমি উত্তরে অ্যাংকর থোম এ নতুন রাজধানী ও বায়ুন নগরে প্রধান মন্দির স্থাপন করেন।
পরিব্রাজকদের মধ্যে এই মন্দিরে প্রথম এসেছিলেন পর্তুগিজ ধর্মপ্রচারক আন্তোনিও দা মাগদালেনার। তিনি ১৫৮৬ সালে প্রথম এই মন্দির এলাকা ভ্রমণ করেন। তিনি লিখেছেন,“এটি (মন্দিরটি) এমন অসাধারণ ভাবে নির্মিত যে, ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। সারা বিশ্বে এরকম আর কোন ভবন বা স্থাপনার অস্তিত্ব নাই। এখানে রয়েছে খিলান ও অন্যান্য কারুকার্য, মানুষের পক্ষে সম্ভাব্য সেরা সৃষ্টি।”তবে পাশ্চাত্যে এই মন্দিরের কথা ছড়িয়ে পড়ে ঊন বিংশ শতাব্দীতে ফরাসি অভিযাত্রী অনরি মৌহত এর ভ্রমণকাহিনীর মাধ্যমে। তিনি লিখেছিলেন,”এই মন্দিরগুলির মধ্যে একটি (অ্যাংকর ভাট), সলোমনের মন্দিরকেও হার মানায়। মাইকেল এঞ্জেলোর মতোই কোন প্রাচীন শিল্পী এটি নির্মাণ করেছেন। আমাদের সবচেয়ে সুন্দর ভবন সমূহের সাথে এটি সমতুল্য। এটি এমনকি প্রাচীন গ্রিস বা প্রাচীন রোমের স্থাপনা গুলির চাইতেও অনেক বেশি রাজকীয়, সুন্দর।বর্তমানে এই দেশটি (কম্বোডিয়া এলাকা) যে বর্বরতার মধ্যে নিমজ্জিত হয়েছে, তার সাথে এই মন্দিরের বিশালতার ও সৌন্দর্যের এক বিশাল ফারাক রয়েছে।” কেউ আবার বলেছেন রোম সাম্রাজ্যের যে শিল্প নিদর্শন দেখা যায়, তার চেয়ে কোন অংশে এই শিল্পকর্ম কম নয়। পাথরের গায়ে খোদাই করা রিলিফ এর কাজগুলো দেখার মত। মস্ত বড় করিডোর আর দেওয়ালে স্থাপত্য শিল্পের অসাধারণ নিদর্শন। প্রতিটি শিল্পকর্মের কথা যদি লিখতে যাই, সেটা এত বড় কাজ সেটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।অ্যাংকর ভাটের নির্মাণশৈলী খমের সাম্রাজ্যের স্থাপত্য শিল্পকলার অনুপম নিদর্শন। ভারতীয় শিল্পকলায় যেমন আমরা বলে থাকি মুঘল ঘরনার কাজ। টেরাকোটাই যেমন বলি বিষ্ণুপুর ঘরানার কাজ। তেমনি সারা বিশ্বে ( আঙ্কোর )খ্মের স্থাপত্যে ঘরানার কাজ বলে নিজস্ব একটি পরিচিতি পেয়েছে। পৃথিবীর কোন দেশে তাদের জাতীয় পতাকায় মন্দিরের ছবি নেই। একমাত্র কম্বোডিয়ায় পতাকায় আঁকা থাকে অ্যাংকর ভাট মন্দিরের ছবি।







এই সব পড়ে দেখে
উত্তরমুছুনএই সব পড়ে, দেখে, ঘুরে মনে হয় কিছু টা হলে ও জন্ম সার্থক।
উত্তরমুছুনঅসংখ্য ধন্যবাদ
মুছুনদারুন লেখা
উত্তরমুছুনঅশেষ ধন্যবাদ
মুছুনVery nice writer up
উত্তরমুছুনঅনেক কিছু জানলাম
উত্তরমুছুনঅশেষ ধন্যবাদ
মুছুনDarun lekha 🥰🥰
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক ধন্যবাদ
মুছুনঅসাধারণ লেখা। যেতে হয়তো কোনদিনও পারবো না। কিন্তু এই লেখা পড়ে ঘুরে এলাম। তাই কোনো দুঃখ থাকবে না।
উত্তরমুছুনঅশেষ ধন্যবাদ
মুছুনআমি ঝুমা চক্রবর্তী। আপনার লেখা পড়ে সত্যিই খুব সমৃদ্ধ হই।
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক ধন্যবাদ
মুছুনঅসাধারণ আপনার লেখা পড়তে পড়তে নিজেকে হারিয়ে ফেলি মনে হয় যে ন কোন পাকা হাতের লেখা পডছি ।
উত্তরমুছুনঅসংখ্য ধন্যবাদ
মুছুনKhub bhlo laglo
উত্তরমুছুনThanks
মুছুনThanks
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক শুভেচ্ছা
মুছুনNice
উত্তরমুছুনধন্যবাদ
মুছুনDarun lekha
উত্তরমুছুনThanks
মুছুনদারুন
মুছুন