গাড়োয়ালের সুন্দর গ্রাম উর্গম

গ্রামের নাম উর্গম 

বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায় ।

গাড়োয়াল হিমালয়ের পবিত্র গ্রাম উর্গম। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস এখানে একসময় কেদারের মন্দির ছিল। নর ও নারায়ণ তাঁদের আরাধনাস্থল হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন উর্গমকে।

সেই গ্রামে যেতে হবে হেলং ছুঁয়ে। হেলং-এর পাশ দিয়ে গর্জন করতে করতে বয়ে যাচ্ছে অলকানন্দা। তার বুকের ওপর দিয়ে সেতু। হেলং থেকে এই সেতু প্রায় এক কি.মি. দূরে। হেলং থেকে দেখা যায় ব্রিজের ওপর দিয়ে সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত লোক চলাচল করছে।এক সময় এই ব্রীজ ছিল লোহার । ব্রিজ থেকে কিছুদূরে বা ঝরনার মতো নেমে আসছে কল্পগঙ্গা। কল্পগঙ্গার সাথে মিলন হচ্ছে অলকানন্দার। তৈরি হয়েছে আরো একটি প্রয়াগ। এই পথ চলেছে কল্পেশ্বরের দিকে, এই পথ দিয়ে চলে যাওয়া যায় রুদ্রনাথে। এই পথই উর্গম যাবার পথ। দুর্গম পথ। হেলং-এর চায়ের দোকানের পাশ দিয়ে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে আস্তে আস্তে নেমে পড়ুন ব্রিজের দিকে। রাস্তাও আছে। দোকানের সামনে থেকে পাঁচ মিনিট হাঁটলেই একটা সাইনবোর্ড: কল্পেশ্বর উর্গম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। উর্গম ব্রিজের ছবি তোলা নিষেধ। বেশ বড় ব্রিজ। পার হলেই মস্ত পাহাড়। পাহাড়ের ধার দিয়ে রাস্তা, রাস্তার ধারেই কল্পগঙ্গা নেমে আসছে। সবসময় হাওয়া বইছে। কিছুদূর যাবার পরই পাহাড়ের গায়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ঘর। তারপর থেকে শুরু হচ্ছে চড়াই। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটা, তবে রাস্তা পরিষ্কার। দুঘণ্টা হাঁটার পর প্রথম পড়বে সালনা গ্রাম। কয়েক ঘর মানুষের বসবাস। একটি চায়ের দোকানও আছে। ক্ষণিকের বিশ্রাম। গ্রামের ঘরে তৈরি হচ্ছে ভেড়ার লোমের কম্বল। সালনা গ্রাম পেরিয়ে যাবার পরই শুরু হচ্ছে জঙ্গল। ভালো করে সূর্যের আলো পর্যন্ত প্রবেশ করে না। দূরে দেখা যায় বড়সড় ঝরনা নেমে এসেছে। আস্তে আস্তে ঢেকে যাচ্ছে বনের মধ্যে। বার্চ, দেবদারু, আখরোট, লেবু, মালটা, পাঙ্গর গাছ। এই জঙ্গলে বাঘ বা লেপার্ড লুকিয়ে থাকা খুব একটা অসম্ভব নয়। হিংস্র জন্তু না দেখতে পেলেও বনমুরগি প্রচুর দেখা যায়। আর রয়েছে নানা জাতের সাপ।


জঙ্গল শেষ হলেই ভেসে উঠবে ঘরবাড়ি। পেছনে দাঁড়িয়ে বড়-বড় পাহাড়, মাথায় বরফ। এটিই উর্গম গ্রাম। ২০২০ মিটার উঁচু। হেলং থেকে দূরত্ব ৬.৫ কি.মি.। মূল গ্রামে ঢুকতে আরও ১ কি.মি. যেতে হয়।

উর্বঋষির নাম অনুসারে গ্রামের নাম উর্গম। গ্রামের পূজারী হর্ষবর্ধন ডিমরি জানান, উর্ব ছিলেন পাণ্ডববংশীয় পুরঞ্জয়ের পুত্র। মহর্ষি উর্ব কঠোর তপস্যা করেছিলেন এই গ্রামে। তিনি ব্রহ্মার সমান গুণী তেজস্বী ছিলেন । গ্রামে উর্ব ঋষির .মন্দির আছে । গ্রাম থেকে দেড় কি.মি. দূরেই সেই মন্দির। উর্গম একটি নাম নয়, বলা যেতে পারে ব্লক। সালনা, থারনা, লেহারি, দেবগ্রাম, বড়গ্রিন্ডা, গ্রিরা, বাঁশা, কল্পেশ্বর গ্রাম মিলিয়ে উর্গম। কল্পেশ্বর যেতে গেলে প্রতি গ্রামকেই ছুঁয়ে যেতে হয়। আর কল্পেশ্বর ঘুরে নামলে ভরকি, পিলকি, গড়ওনা, বেরঠা, উরসি, হেলং। প্রতিটি গ্রামের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহর্ষি, দেবতাদের নানা গল্পকথা। উর্গমের মানুষরা বলেন, বদ্রীনারায়ণে শেষনাগের চক্ষু আছে। তিনি এখানে বহুদিন বসবাস করেন। শেষনাগ ছিলেন নাগবংশের রাজা। শেষনাগের মাথায় প্রত্যেক কল্পের শেষে বিষ্ণু অবস্থান করেন। পুরাণে আছে, শেষনাগ দক্ষের অন্যতমা কন্যা, কশ্যপের স্ত্রী কদ্রুর গর্ভজাত নাগদের অন্যতম। সপত্নী বিনতাকে ছলনা করবার জন্য কদ্রু নিজ পুত্রদের সাহায্য । প্রার্থনা করেন; কিন্তু শেষনাগ এবং কয়েকটি নাগ মাতাকে সাহায্য করতে অসম্মত হয়। ফলে মাতৃশাপে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করতে হয়।


শঙ্করাচার্য প্রথম নাকি এখানেই কেদারের মন্দির স্থাপন করেন। এখন উর্গম গ্রামের মানুষ ঠিক কেদারনাথের মতোই দেখতে একটি মন্দিরকে কেদার মন্দির বলেন। চাষের জমির মধ্যে এই মন্দির কিছুটা মাটিতে বসে গেছে। সামনে রয়েছে পাথরের ষাঁড়। মন্দিরের  মাথায় একটা ও পতাকা টাঙানো ছিল একসময়। মন্দিরটা যে ও প্রাচীন তা দেখলেই বোঝা যায়। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আজ নষ্ট হতে বসেছে। উর্গম গ্রামের প্রভাবশালী মানুষ হায়াৎ সিং বলেন, এই গ্রামেইতো পঞ্চকেদার এবং পঞ্চবদ্রী। কল্পেশ্বর মন্দির এর ওপরে। ধ্যানবদ্রীর ওপরে বিশ্বনাথ মন্দির, সেতুবন্ধনের রামেশ্বর মন্দির এবং বুড়ো শিব মন্দির। মহাপ্রস্থানের পথে পঞ্চপাণ্ডব এই কল্প গ্রামে এসেছিলেন।


গ্রামে কাঠ আর পাথরের ছোট-ছোট দোতলা-একতলা বাড়ি। প্রতিটি বাড়িতে গরু, ঘোড়া, ছাগল ও ভেড়া আছে। হর্টিকালচারের অফিস রয়েছে। আম, লিচু, কাঁঠাল বাদ দিলে প্রায় সবরকমের ফলের গাছই নাকি এখানে আছে। আমরা গিয়েছিলাম মে মাসের মাঝামাঝি। তখন পাহাড়ের মাথায় বরফ আর মাঠে সোনালী গম পেকে আছে। ভেড়াগুলো এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘোড়ার গলায় ঘণ্টা বেঁধে কিশোর ছেলেরা নিয়ে যাচ্ছে জঙ্গলে। ঊর্গম থেকে করেম্বর প্রায় দেড় কি.মি.। উচ্চতা ২১৩৪ মিটার। বেশিরভাগ মানুষ জানেন কল্পেশ্বর যেতে এই গ্রাম পড়ে কিন্তু অনেকেই জানেন না, কল্পেম্বরও উর্গমের মধ্যেই। কেদারনাথের মতোই এখানে রয়েছে একটি শিলাখণ্ড। একটি বড় শিলাখণ্ডের নিচে বড় একটি প্রাকৃতিক গুহার মধ্যেই কল্পনাথের অধিষ্ঠান। তাঁর পাশেই গণেশের মূর্তি। বাইরে একটি ছোট কুণ্ড। এখান থেকেই জল নিয়ে দেবতার মাথায় ঢালা হয়। পুরাণ বলে, এখান দিয়ে বয়ে যেত হিরণ্যবতী নদী। মন্দিরের পাশে একটি গুহায় থাকতেন বাঙালি বাবা। তিনিই পুজোর ব্যবস্থা করেন।


ব্রিজের পাশ দিয়ে একটা রাস্তা চলে গেছে জঙ্গলে। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ২ কি.মি. হাঁটার পর শুন বলে একটি জায়গার সন্ধান মেলে। এই শুনে রয়েছেন এক নাগাবাবা। তার মন্দিরটিও সুন্দর। সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ। মন্দিরের নাগাবাবার একটি হাত সবসময় মাথার ওপরে তোলা। উর্গমের মানুষ এই নাগাবাবাকে পরম ভক্তি করেন। চামোলি জেলার বহু মানুষ শুধু তাঁর দর্শন পাবার জন্য শুন গ্রামে চলে আসেন। গ্রামে প্রবেশের সময় পঞ্চবদ্রীর প্রথম বদ্রী ধ্যানবদ্রী চোখে পড়ে। ধ্যানবদ্রীকে এখানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শঙ্করাচার্য। মন্দিরের ভেতরে গণেশ, নারদ, কুবের এবং বাইরে গরুড়ের মূর্তি রয়েছে। ধানবদ্রী থেকে প্রায় ২ কি.মি. হাঁটলে বংশীনারায়ণ। এই বংশীনারায়ণকে উর্গর্মের মানুষ ভীষণ ভক্তি করেন। স্থানটি খুবই দুর্গম। জঙ্গলে ঢাকা। আমরা অর্ধেক রাস্তা থেকে ফিরে এলাম। বংশীনারায়ণে কোনও পুরোহিত প্রতিদিন পুজো করেন না। যাঁরা ঘোড়া বা ভেড়া নিয়ে জঙ্গলে যান তাঁরাই বনের ফুল, ঘাস দিয়ে বংশীনারায়ণের পুজো দেন। রাখী পূর্ণিমার কয়েকদিন আগে থেকে পুরোহিত বংশীনারায়ণে চলে যান। ওইদিন চামোলি জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ এসে জড়ো হন সেখানে। বিশাল মেলা বসে। মেলায় প্রায় হাজার দশেক মানুষ উপস্থিত থাকেন। প্রত্যেকেই মন্দিরের সামনে একে অপরের হাতে রাধী পড়িয়ে দেন। সন্ধের সময় মশাল জ্বালিয়ে নাচ-গানও হয়। আমাদের এখানে যেমন দুর্গাপুজো তেমনই উর্গমবাসীদের কাছে রাখী পূর্ণিমা। সেইসময় ঘর সাজানো হয়, লোকে নতুন জামাকাপড় পড়েন। একদিনের উৎসব হলেও তার রেশ থাকে তিনদিন।



উর্গমের সবচেয়ে সুন্দর অঞ্চল ফুলনারায়ণ। ফুলনারায়ণ আমরা যেতে পারিনি। কেননা সেইসময় ফুলনারায়ণ মন্দির খোলেনি। পুরো মন্দির বরফের তলায়। ব্রিজ পেরিয়ে ফুলনারায়ণ যেতে হয় অথবা হেলং থেকে নেমে এসে ২ কি.মি. যাবার পর ছোট্ট একটা ব্রিজ পেরিয়ে ফুলনারায়ণ যাওয়া যায়। ভরকি,চেরঠা , পেলকি, গড়গুনা হয়ে যেতে হয়। কল্পেশ্বরের থেকে প্রায় ৫ কি.মি. দূরে। রাস্তা একদম খাড়াই। ফুলনারায়ণ ১২ হাজার ফুট উঁচুতে। ফুলনারায়ণে রয়েছে আরেক বদ্রী। নারায়ণএখানে পদ্মফুলের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাঁরই নাম অনুসারে গ্রামের নাম। মন্দিরটিও নাকি খুবই সুন্দর। আমরা দূর থেকে দেখেছি, মন্দিরের পাশ দিয়ে বসুধারার মতো বিশাল ঝরনা নেমে এসেছে। এই ফুলনারায়ণ একটি ফুলের উপত্যকা। কয়েক কি.মি. অঞ্চল জুড়ে জুলাই-আগস্ট মাসে ভরে ওঠে ফুলে। স্থানীয় মানুষ ব্রহ্মকমল তুলে ফুলনারায়ণের পুজো দেন। 



প্রয়োজনীয় তথ্য

হরিদ্বার থেকে হেলং-এর দূরত্ব ২৬৩ কি.মি.। হরিদ্বার বাসস্ট্যান্ডের উল্টোদিক থেকে বাস পাওয়া যায়। লোকাল বাস। হৃষিকেশ থেকেও বাস ধরতে পারেন। যে বাস যাচ্ছে বদ্রিনারায়ান এর দিকে । সকাল ছটায় বাস ছাড়লে বিকেল চারটের মধ্যে পৌঁছে যাবেন। হেলং-এ থাকার জায়গা বলতে রাস্তার ধারে দোকানের সঙ্গে লাগোয়া দু একটি থাকার জায়গা আছে। হেলং থেকে উর্গম প্রায় ৭ কি.মি.। মে মাসে প্রচণ্ড ঠান্ডা। উর্গমের দেবগ্রামে ট্যুরিস্ট লজ আছে। লজ দেখাশোনা করেন দুর্লভ সিং। পাশেই তার চায়ের দোকান। উর্গম থেকে বংশীনারায়ণ একদিকে, উল্টোদিকে ফুলনারায়ণ। একা যেতে পারবেন না। গাইড অবশ্যই লাগবে। খোঁজ করুন প্রেম সিং নেগী । ফুলনারায়ণ, বংশীনারায়ণ, উর্বঋষির আশ্রম, হনুমানগিরি কোথাও খাবার পাওয়া একটু মুশকিল।শুকনো খাবার, লাঠি এবং শীতের পোশাক ও জলের বোতল অবশ্যই নেবেন। উর্গম গ্রামের সবকিছু দেখতে মোটামুটি চারদিন সময় লাগে। এ অঞ্চলে জিনিসপত্রের দাম একটু বেশি।

*ছবি  নেট থেকে নেওয়া 

মন্তব্যসমূহ

  1. খুব ই সুন্দর লেখা ও ছবি গুলো

    উত্তরমুছুন
  2. অসাধারণ লেখা...পরতে পরতে ঘুরে নিলাম

    উত্তরমুছুন
  3. মুগ্ধ।। Moderate na difficult trek?

    উত্তরমুছুন
  4. Khub bhalo laglo...chokher samne chobir moto fute uthlo...jete parle dhonno mone korbo...anek dhonyobad 🙏

    উত্তরমুছুন
  5. দারুন লেখা যাত্রাপথের খুব সুন্দর বর্ণনা করেছেন

    উত্তরমুছুন
  6. অসম্ভব সুন্দর লেখা.. মন ভরে গেল..💕🌿💕

    উত্তরমুছুন
  7. অসাধারণ জানার কোন শেষ নেই পথের কোন শেষ নেই পডতে পডতে কখন আপনার সফরে র সাথী হযেছি নিজে জানি না ।

    উত্তরমুছুন
  8. অসাধারন লেখা। খুব ভালো লাগলো

    উত্তরমুছুন
  9. দারুন ভালো লাগল লেখা পড়ে।

    উত্তরমুছুন
  10. পড়তে পড়তে চাক্ষুষ করলাম। প্রকৃতি ও পুরাণের মেলবন্ধন পেলাম।

    উত্তরমুছুন
  11. পড়তে পড়তেই দেখা। যাওয়া আর হবে না। তাই হোক। সুন্দর লেখা।

    উত্তরমুছুন
  12. চমৎকার একটা নতুন জায়গা এবং ছবির মতন সুন্দর।বর্ণনা পড়ে চোখের সামনে ভেসে উঠল।

    উত্তরমুছুন
  13. Apnar lekhate. Jaigata ghora hoie galo. Khub bhalo barnana. Samridhya holum.

    উত্তরমুছুন
  14. খুব সুন্দর বর্ণনা, শুভেচ্ছৃ

    উত্তরমুছুন
  15. উর্গম এর কথা পড়েছি, কিন্তু আপনার লেখায় বিস্তারিত জানলাম।খুব সুন্দর বর্ণনা, আপনার সাথে মানস ভ্রমণ হলো 👌👌

    উত্তরমুছুন
  16. অসাধারণ আপনার লেখা পড়তে পড়তে নিজেকে হারিয়ে ফেলি কখন যে আমি ও আপনার সফরে র সাথী হযে যাই নিজে ও জানিনা।

    উত্তরমুছুন
  17. Khub bhalo laglo. Aamra bhromon kori but onek kichu ojana thake ja sompurno ta pai aaponar lekha gulo porle.

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মধেরার সূর্য মন্দির

মিশর ভ্রমণের নান্দীমুখ।

হালিশহর এক দিনের ভ্রমণ।