ইউরোপের বিড়াল

ইউরোপের বিড়াল

বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায়

আমার বন্ধু বিপুল  হঠাৎ করে আমার হাতটা টেনে ধরল।আমরা হাঁটছিলাম ফ্রান্সের এক রাস্তায়। জায়গাটা তেমন জনবহুল নয়। রাত হয়েছে, তবুও সূর্য ডুবি নি। কেউ কোথাও নেই বিপুল আমার হাতটা টেনে ধরল কেন? তাকিয়ে দেখি একটা বিড়াল রাস্তা ক্রস করে  উল্টো দিকে দৌড়ে চলে গেল। মানে বিড়াল রাস্তা কেটে দিল। এক পলকে ভাবি বিপুল বহুদিন লন্ডনে আছে, তার ভিতরেও রয়েছে সেই ভারতীয়  কুসংস্কার! মুখে কিছু না বলে আমিও দাঁড়িয়ে পড়লাম। 


ভারতে রাস্তায় বেড়াল মানে একটা অশুভর ইঙ্গিত। বিড়াল যদি রাস্তা পার হয়ে যায়, সমস্ত চালক গাড়ি থামিয়ে দেয়। অন্য কেউ সেই রাস্তা পার হয়ে যাওয়ার পর সেই চালক আবার যাত্রা শুরু করেন। যারা বড় বড় ট্রাক বা লরি চালান তাদের কাছে বিড়াল বিরাট শত্রু। কেন যে এই সংস্কার  সেটা এখনো অনুমান করতে পারিনি।

 ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় একই নিয়ম বিড়াল রাস্তা পার হলেই, গাড়ি থেমে যায়। তাহলে কি ইউরোপিয়ান দেশগুলো ভারতীয়দের মতো বিড়ালের প্রতি কুসংস্কারাচ্ছন্ন?

 লন্ডনের বেকার স্ট্রিটের কাছে আমার এক বন্ধু  দোকানে চাকরি করেন। এবার তার সাথে দেখা হয় নি,তবে ফোনে কথা হয়। সেই দিন রাতে তাকে ফোন করি। বিড়ালের বিষয়টি তাকে জিজ্ঞেস করি। সে ফোনের মধ্যেই হাসতে থাকে। তার পরে বলে ব্রিটিশরা ২০০ বছর রাজত্ব করে এসেছে আমাদের দেশে  তাদের কিছু সংস্কার আমাদের দেশে থাকবে না! তার হেঁয়ালি উত্তরে চুপ করে থাকি। তার পর সে বলে, আসলে তা নয়। শুধু লন্ডন কেন ইউরোপে  প্রতিটি বাড়িতেই দুটো তিনটে করে বেড়াল থাকতো। আর এই বিড়াল গুলোকে নিয়ে  বিকেলের দিকে  বাড়ির ছোটরা ঘুরে বেড়াতো । ছেড়ে দিলেই বিড়াল গুলো এদিক ওদিক দৌড়ে পালাতো। তাদের ধরার জন্য বাচ্চারা তাদের পেছনে  ছুটে  যেত। গাড়ির চালক জানতেন  বিড়াল রাস্তা দিয়ে চলে যাওয়া মানেই পিছনে একটি শিশু আসছে। তাই তিনিও গাড়ি থামিয়ে  দিতেন। তবে এখন বিড়ালের সংখ্যা অনেক কমে গেছে।

 বছর পাঁচেক আগে  আমি যখন ইউরোপে গিয়েছিলাম। তখন দেখেছিলাম বিভিন্ন মলে, প্লাস্টিকের খাঁচার ভেতরে  বিড়াল নিয়ে মেয়েদের কেনাকাটা করতে। তবে এখন বিড়াল  নিয়ে ঘুরছে এটা একটু কমই দেখা যায়। তার বদলে এসেছে কুকুর। বিভিন্ন মলে রাস্তাঘাটে সকলেই কুকুর নিয়ে ঘুরছেন। গাড়িতে উঠছেন কুকুর নিয়ে, বাসে উঠছেন কুকুর নিয়ে, ট্রামে উঠছেন কুকুর নিয়ে। কারোর কোন আপত্তি নেই।

 ইউরোপে বিড়াল দেখা যাচ্ছে কম কেন? এটা আমার মনের মধ্যে  ইউরোপে বসে ঘুরপাক খাচ্ছিল। তবে রাস্তায় আমি প্রচুর বিড়াল দেখেছি। আমাদের দেশের মতো বড় বড় বেড়াল নয়,একটু ছোট ছোট খুব দ্রুত দৌড়াতে পারে। রংগুলো একটু বাদামী বা খয়রি খয়রি।

লোকজন আর বেড়াল নিয়ে বের হচ্ছে না। বেড়ালের বদলে সব কুকুর নিয়ে ভ্রমণ করছেন।

পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বিড়াল আছে আমেরিকাতে। সংখ্যাটা শুনলে চমকে উঠবেন। শুধুমাত্র  গৃহপালিত বিড়ালের সংখ্যা ৯৩.৫ মিলিয়ন। আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রে  সমস্ত পরিবারের প্রায় এক তৃতীয়াংশ কমপক্ষে একটি করে বেড়াল রাখে।

পড়তে পারি কি না পারি  যেখানেই পাই একটা করে খবরে কাগজ চোখ বুলিয়ে নি। ইংল্যান্ড বাদে ইউরোপের খুব কম দেশে ইংরেজি  নিউজ পেপার পাওয়া যায়। ইংল্যান্ডের মোড়ে মোড়ে যেমন বিনা পয়সা খবরের কাগজে রেখে দেয়া হয়। ফ্রান্সের ও বিভিন্ন মলে জনপ্রিয় রাস্তার মোড়ে, ডেলি নিউজ পেপার রাখা থাকে। ফ্রান্স থেকে অস্ট্রিয়া যাওয়ার পথে একটি মলে  ইংরেজি কাগজ পেয়েছিলাম। তাতে দেখি বিড়ালের ছবি টবি দিয়ে  প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। কাগজটি বিনা পয়সা দেয়া হচ্ছে না, কিনতে হবে ইউরো দিয়ে। কিনে নিলাম বেশ কষ্ট করেই। আমরা এখানে পাঁচ টাকায় খবরে কাগজ পাই। ওখানে কিনতে হলো ২০০ টাকা দিয়ে। ছিল রুমাল হলো বিড়াল এই আর কি!

 আমার আবার মা ষষ্ঠীর বাহনদের নিয়ে খুব একটা ভালো লাগা নেই। বিড়ালের জন্য ২০০ টাকা খরচা করতে বেশ গায়েই লেগেছিল। ইউরোপিয়ান মহাদেশে  দু'রকম বেড়াল দেখা যায়  যাদের বাড়িতে পোষা হয়  তাদের বলা হয় ফেলিস ক্যাটাস আর বন্য বেড়াল দের বলা হয় ফেলিস  সিলভেস্ট্রিস । ফ্রান্স এবং ইতালিতে  বন্য বিড়াল প্রধানত নিশাচর। কিন্তু দিনের বেলায় সক্রিয় থাকে যখন মানুষের ক্রিয়াকলাপে বাধা গ্রস্থ হয় না। এরা ইঁদুরের মতো ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শিকার করে বেশি। শুনলে অবাক হতে হয়, ইউরোপীয় বন্য বিড়ালের জন্য নিরাপত্তা জাল প্রকল্পটি শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো ইউরোপিয়ান বন্য বেড়ালদের বসবাস  উপযোগী এলাকাগুলির মধ্যে ঝোপ ও গাছ লাগাতে হবে এবং সেই ঝোপ গুলোর সাথে জার্মানির বনগুলোর সঙ্গে একটা করিডোর করা হয়েছে। শুনলে অবাক হতে হয়, জার্মানিতে  ইউরোপের  বন্য বেড়ালের সুরক্ষার জন্য একটি অ্যাকশন প্ল্যান ২০০৯ সালে তৈরি করা হয়েছিল। যার লক্ষ্য ছিল ইউরোপের বন্যবিড়াল সংখ্যা দ্বিগুণ করা। শুধু তাই নয়, সারা ইউরোপীয় দেশগুলো  বছরে একবার করে  বিড়াল গণনার কাজে নেমে যায়। বিড়ালের সংখ্যা কমে যাওয়ার জন্য  ইউরোপের মানুষরা  আর বাড়িতে বেড়াল পুষতে ভয় পান।

*ছবি নেট থেকে  নেওয়া।

ইউরোপ ভ্রমণ নিয়ে আমি কিছু লিখব বলেছিলাম।

আজ এটি প্রথম লেখা।  যদি আপনাদের ভালো লাগে তবেই কয়েকটি অংশ লিখবো। অবশ্যই কমেন্ট করবেন।আবার তিনদিন পরে পরের লেখাটা দেবো।


মন্তব্যসমূহ

  1. কুকুরেপনা বিষয়টা বেশ প্রচলিত কিন্তু এই বেড়ালেপনাটা একেবারে নতুন এবং আকর্ষণীয়।

    উত্তরমুছুন
  2. ঋদ্ধ হোলাম। পরের লেখার অপেক্ষায় রইলাম।

    উত্তরমুছুন
  3. Jhuma Chakraborty.
    খুব ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  4. খুব ভালো একটি লেখা। তথ্যসমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয়। লেখার গুণে শেষ পর্যন্ত একটানে পড়ে যেতেই হবে।

    উত্তরমুছুন
  5. শিক্ষণীয় ও সমাজসচেতনতামূলক লেখা

    উত্তরমুছুন
  6. ইউরোপ ঘুরে এলেও তথ্য টি অজানা ছিল। জেনে ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  7. অনেক অজনা তথ্য জানতে পারলাম। দারুণ লাগলো। পরবর্তী লেখার অপেক্ষায়..

    উত্তরমুছুন
  8. বিড়াল সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারলাম।

    উত্তরমুছুন
  9. খুব সুন্দর লাগল অজানা তথ্য জানতে পারলাম ।

    উত্তরমুছুন
  10. অজানা কে জানা হল। ধন্যবাদ

    উত্তরমুছুন
  11. এই কুসংস্কার এর background টা আমি আগেই জানতাম। তাও আপনার presentation টা ভালো লাগলো। ইউরোপ নিয়ে আরো লিখুন।

    উত্তরমুছুন
  12. অজানা গল্প পড়ে ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  13. যদিও বিড়াল আমার ভালো লাগে না, কিন্তু লেখাটা খুব ভালো লাগল।

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মধেরার সূর্য মন্দির

মিশর ভ্রমণের নান্দীমুখ।

হালিশহর এক দিনের ভ্রমণ।