আইফেল টাওয়ারের বিয়ে!

আইফেল টাওয়ারের বিয়ে!

বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায় 

হীরা বাবু কানে কানে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন এরা কি আইফিল টাওয়ার রং করবে? সেই জন্যই কি ওরা এসেছে? কারা? এই যে এরা? এরা কারা? তাকিয়ে দেখি  ভারতের একটি বিখ্যাত রঙ কোম্পানির প্লাকার্ড নিয়ে অনেক মানুষ  দাঁড়িয়ে আছেন । কেউ লাইনে দাঁড়িয়ে, কেউ এদিক ওদিক ঘুরছেন। হীরাবাবু তাদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, কতজন এসেছেন? তার উত্তরে শোনা গেল ১০০ জনের বেশি লোক এসেছেন রঙ কোম্পানি থেকে। হীরা বাবু আমাকে জিজ্ঞেস করলেন : ১০০ জন মিলে পারবে এত বড় আইফেল টাওয়ারকে রঙ করতে? এর উত্তর আমার জানা নেই। অনেক কষ্টে তাকে বোঝালাম  এরা রঙ কোম্পানির ডিলার। ওরাও ভ্রমণ করতে এসেছেন ।


আইফেল টাওয়ারকে রঙ করতে কত রঙ লাগে? শিল্পচর্চা ও সংস্কৃতির পীঠস্থান প্যারিস । কোন মিউসিয়ামে, কোন স্কুলে, পার্লামেন্ট এ কি রঙ হবে, এই নিয়ে বহুবার ফ্রান্সে আন্দোলন পর্যন্ত হয়েছে। ফ্রান্স পৃথিবীকে উপহার দিয়েছে বড় বড় চিত্রকরদের। ফ্রান্সের মানুষজন একটু উন্নাসিক। আত্মমগ্নতায় ডুবে থাকেন। ইংরেজি জানা মানুষদের সঙ্গে একদমই কথা বলতে চান না। ফ্রান্সের এক কফি শপে পরিচয় হয়েছিল এক তরুণ শিল্পীর সাথে। তাকে দেখেছিলাম রাস্তার ধারে  বিরাট এক ক্যানভাসে ছবি আঁকছিলেন। কথায় কথায় তিনি বলেছিলেন,আইফেল টাওয়ার ফ্রান্সের সবচেয়ে দুঃখজনক লোহার খাঁচা। এর মধ্যে কোন শিল্প নেই। আমার খারাপ লাগে প্রতিদিন সকালবেলা চোখ খুললেই  এই লোহার খাঁচাটা দেখতে হয়। তার কথা মতো এই "লোহার খাঁচাটা" রঙ করা বড় কঠিন  কাজ। আইফেল টাওয়ার রঙ করতে যে রঙ এর ব্যবহার হয়েছিল তা বিশেষভাবেই মিশ্রিত। ১৯৬৮ সাল থেকেই সেই রঙের পরিচয় 'আইফেল টাওয়ার ব্রাউন' নামে । আইফেল টাওয়ার প্রতি সাত বছর পর নতুন করে রং করা হয় এবং সেখানে প্রায় ৬০ টন (৬১০৯৯ লিটার) রং লাগে।


 *আইফেল টাওয়ারের বিয়ে* 

 প্রেমের শহর ফ্রান্স। বাতাসে একটা প্রেম প্রেম ভাব। মন দুলে ওঠে।সেইন নদীর জলেও প্রেমের ঢেউ। সেখানে আইফেল টাওয়ার প্রেম করবেন না এটা হয়? ২০০৭ সালে একটা ঘটনা ঘটেছিল। ফ্রান্সের এক ভদ্র মহিলা নিজের দাম্পত্য জীবনের থেকে বিরক্ত হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন। ঠিক করলেন আর কোন মানুষকে তিনি বিয়ে করবেন না। সোজা চলে এলেন সেই নদীর তীরে।  ফুলের মালা দিয়ে বিয়ে করে নিলেন আইফেল টাওয়ারকে। সেদিন থেকে তার নাম বদল হয়ে গেল। তাকে এখন চেনে পৃথিবীর মানুষ এরিকা লা টুর আইফেল নামে।

লোহার আবার প্রাণ আছে নাকি? তাকে কি বিয়ে করা যায়? প্রাণ থাকুক আর না থাকুক তিনি শীতকালে একটু ছোট হয়ে যান আর গরমকালে বেড়ে ওঠেন।এমনিতে তার উচ্চতা ৩০০ মিটার।গরমে ছয় ইঞ্চি বাড়ে, শীতে ছয় ইঞ্চি কমে।


দুবার বিক্রি হয় আইফেল টাওয়ার

জালিয়াতি করে প্যারিসের আইফেল টাওয়ার বিক্রি করে দিয়েছিলেন এক ব্যক্তি। তাও আবার দুই–দুইবার! অসম্ভব কাণ্ডটি ঘটিয়েছিলেন ইউরোপ–আমেরিকায় জালিয়াতি করে ‘নাম কুড়ানো’ ভিক্টর লাস্টিগ। ‘কাউন্ট’ ভিক্টর লাস্টিগ নামেও কুখ্যাত ছিলেন তিনি।

১৯২৫ সালে পত্রিকায় একটি লেখা পড়েন ভিক্টর লাস্টিগ। সেখানে জানতে পারেন, আইফেল টাওয়ার সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন, তার জোগান দিতে সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ব্যয়ভার বহন করার চেয়ে টাওয়ারটি রদ্দি হিসেবে বেচে দেওয়াই ভালো কি না, এমন প্রশ্ন তোলা হয় লেখাটির শেষ দিকে। আর এই শেষ লাইন থেকেই লাস্টিগের মাথায় আইফেল টাওয়ার বেচে দেওয়ার বুদ্ধিটি আসে। আর শুরু করে দেন জাল দলিল-দস্তাবেজ তৈরির অপকর্ম।

আন্দ্রে পয়সন নামের এক ফরাসি ব্যবসায়ীকে ফাঁদে ফেলেন লাস্টিগ। তাঁর সঙ্গে আলোচনায় বসেন। পয়সনকে তিনি নকল মন্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিয়ে জানান, মন্ত্রী হিসেবে তাঁর অবস্থান নাজুক এবং তিনি সুযোগ–সুবিধাবঞ্চিত। এসব বলে তিনি আদতে পরোক্ষভাবে ঘুষ দাবি করেন। অন্যদিকে পয়সন চাইছিলেন ব্যবসায়ীমহলে নিজের একটা উঁচু অবস্থান তৈরি করতে। তাই তিনি যেভাবেই হোক আইফেল টাওয়ারটি কিনতে চাইছিলেন। কাজেই লাস্টিগকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতেও তাঁর দ্বিধা ছিল না। লাস্টিগ পুরো টাকা পাওয়ার পর পগারপার। প্রায় ৭০ হাজার ফ্র্যাঙ্ক হাতিয়ে নিয়ে আমেরিকা পাড়ি দেন ।ঠিক এই একই কায়দায় আবার এক ব্যবসায়ী কে তিনি আইফেল টাওয়ার বিক্রি করেছিলেন। 


কে বানালো আইফেল টাওয়ার

ফরাসি বিপ্লবের কথা আমরা অনেকে শুনেছি, অনেক বই ও পড়েছি । "স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রী " এই স্লোগানে কেঁপেছে সারা ফ্রান্স। হিটলার চলে যাওয়ার পর, স্বাধীন ফ্রান্স বিশ্ব বাণিজ্য মেলার আয়োজন করেছিলেন।  অতিথিদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য  তৈরি হয়েছিল আইফেল টাওয়ার। আইফেল টাওয়ার তৈরি হওয়া না হওয়া নিয়ে অনেক গল্প আছে।   

১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সের নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনে জুলেস গ্রেভি প্রেসিডেন্ট হিসাবে পুনরায় নির্বাচিত হন। এই  সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান লোক্রোয় । ১৮৮৬ ক্রিষ্টাব্দের ১লা মে, লোক্রোয় আইফেল টাওয়ারের  গুস্তাফ আইফেলের নকশার অনুমোদনের ঘোষনা দেন। ১২ মে এই নকশার বিষয়টির সাম্ভ্যবতা নিয়ে একটি পর্যবেক্ষণ দল পরীক্ষা করেন। ১২ জুনে পুরো বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। এরপর আরও বহু বৈঠকের পর ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ৮ জানুয়ারিতে গুস্তাফ আইফেলের সঙ্গে সরকারের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর এই টাওয়ারটি তৈরির কাজ শুরু হয় এবং শেষ হয় ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে। ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ মার্চ তারিখে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।

ছবি : আমার মোবাইলে তোলা।

মন্তব্যসমূহ

  1. খুব ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  2. এমন ভাবে আইফেল টাওয়ার কে জানবো ভাবিনি, অসংখ্য ধন্যবাদ

    উত্তরমুছুন
  3. খুব সুন্দর লেখা ভালো লাগল।

    উত্তরমুছুন
  4. একটা নতুন ধরনের লেখা পড়লাম। খুব সুন্দর

    উত্তরমুছুন
  5. নতুন ভাবে জানলাম আইফেল টাওয়ার কে।

    উত্তরমুছুন
  6. তথ্যসমৃদ্ধ দুর্দান্ত লেখনি-❤️

    উত্তরমুছুন
  7. অজানা অনেক তথ্য জানলাম। আপনার কলমে এই রকম আরো শিল্প প্রকাশিত হোক

    উত্তরমুছুন
  8. পার্থ প্রামাণিক২ জুলাই, ২০২৩ এ ৫:১৫ PM

    কত কিছু জানলাম

    উত্তরমুছুন
  9. আপনার লেখাতে নতুনভাবে কিছু থাকবেই ।খুবই সুন্দর ।

    উত্তরমুছুন
  10. পড়ে ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  11. খুব ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  12. খুব সুন্দর লেখা

    উত্তরমুছুন
  13. Ank kisu jntey parlm dada ..khub valoi laglo jntey pere...

    উত্তরমুছুন
  14. আপনার লেখাটি পড়ে ifel টাওয়ার সম্পর্কে আরো ভালো আগ্রহ তৈরি হোল। দেখা এবং জানার মধ্যে মেল বন্ধন তৈরী হলো এবং আপনি হলেন সেই প্রিয় কারিগর যিনি এটা করেছেন।

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মধেরার সূর্য মন্দির

মিশর ভ্রমণের নান্দীমুখ।

হালিশহর এক দিনের ভ্রমণ।