অঙ্গপ্রদেশ।

বঙ্গের চোখে অঙ্গপ্রদেশ।

বামা পদ গঙ্গোপাধ্যায় 

রুচির সমগ্রতা বলে একটি কথা আছে। আজ যা ভালো লাগছে কালকে ভালো নাও লাগতে পারে। সেই ছোটবেলায় বেরিয়ে পড়েছিলাম ভ্রমণে। কৈশোর থেকে যৌবনে পা দেওয়ার সময় চলে গিয়েছিলাম বিহারের বিভিন্ন পর্যটন স্থানে। সেদিনও আমার মনে হয়েছিল, বিহারের মতো এতো  দেখার জিনিস ভারতবর্ষে খুব কম আছে। এখনো সেটাতেই আমি বিশ্বাস করি। ভ্রমণে গিয়ে সকলেই খোঁজেন, এই অঞ্চলটার মধ্যে আমি আছি কিনা। বিহারের প্রতিটি  অঞ্চলে, নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায় এটাই বিহারের বৈশিষ্ট্য। 




 এবারে গিয়েছিলাম অঙ্গপ্রদেশে। বঙ্গপ্রদেশ থেকে অঙ্গপ্রদেশে যাওয়ার জন্য, কোন মানসিক প্রস্তুতির দরকার হয় না। ১৯১২ সাল পর্যন্ত  বঙ্গ আর অঙ্গ একই জায়গায় ছিল। এই অঙ্গদেশে এসে, শুধু অঙ্গ নয়, প্রাণ এবং বায়ুর দুটোরই পরিবর্তন হয়েছে। হয়েছে চোখের আরামবোধ। বঙ্গের মানুষ, বিহারের নাম শুনলে একটু ভয় পান। কেন পান আমি ঠিক জানিনা। এই সেপ্টেম্বর মাসে আমি রাত্রি দশটা এগারোটা পর্যন্ত, অঙ্গ প্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছি, না দেখেছি কোন রাজনৈতিক ডামাডোল, না পেয়েছি কোনো কিছুর ভয়।

 বাঙালির বায়ু পরিবর্তনের একমাত্র জায়গা ছিল বিহার, এখন সেই কথাটাই বাঙালি ভুলতে বসেছে।  শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বনফুল থেকে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। এই মাটি থেকে গড়ে তুলেছিলেন সৃষ্টির অমরত্ব। এটা কে বলে মাটির গুণ। যে শহরের পাশ দিয়ে গঙ্গা বয়ে যাচ্ছে। তার গুণ থাকবে না? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বুঝতে পেরেছিলেন, যার জন্য বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনে তাকেও আসতে হয়েছিল ভাগলপুরে। 


এখন কথা হচ্ছে আমি কেন অঙ্গ প্রদেশ বলছি? বলছি এই কারণেই এটাই ছিল রাজা কর্ণের  রাজধানী। অন্যের রাজধানীতে এসে কি দেখলাম? আমি ঠিক এইভাবে বলতে চাইছি না। কি দেখলাম না, কিভাবে দেখলাম সেটাই বড় কথা। অঙ্গ-প্রদেশে এসে আমি  দেখেছি ইতিহাস, দেখেছি মাইথোলজি, পাহাড় নয়, দেখেছি পর্বতমালা। রাজমহল কিন্তু পাহাড় নয়, পর্বত।দেখেছি সাহিত্যের  মাটি। দেখেছি প্রকৃতি। যে প্রকৃতির বুকে রয়েছে অসাধারণ কিছু লেক, অরণ্য,ছোট ছোট টিলা, পুরাণের পাতা থেকে উঠে আসা মন্দার পর্বত। 


 অঙ্গ-প্রদেশ কে বলা যেতে পারে লেকের শহর। পাশে রয়েছে, খড়গপুর লেক। যার তুলনা সে নিজেই। ভীম বাঁধ এখানে শুধু জঙ্গল নয়, রয়েছে উষ্ণপ্রস্রবণ। সীতাকুণ্ডের মতো পবিত্র স্থান। আরো একটু এগিয়ে গেলে  ঘোড়াখুর জলপ্রপাত। এখনো পর্যটকদের কাছে অপরিচিতই রয়ে গেছে। আর বাঁকা এবং  বংশীতে একবার যদি কেউ ঘুরতে যান। তার মন প্রাণ সব জুড়িয়ে যাবে। ওড়নি বাঁধ। লক্ষীনারায়ন বাঁধ। আর এক পাশে মন্দার পর্বত।ওড়নি এসে কোন পর্যটক চিন্তাই করতে পারবেন না, লেকের জলে রংবেরঙের স্পিডবোর্ড।যে মন্দার পর্বত কে মন্থন দণ্ড করা হয়েছিল সেই মন্দার পর্বতটি এখন পর্যটকরা  রোপোওয়ে চড়ে পরবর্তী মাথায় ঘুরে আসতে পারেন। এই পর্বতের মাথায় রয়েছে  জৈন ধর্মের অন্যতম তীর্থঙ্কর   বাসুপূজ্য মূর্তি। 


 যদি শিল্প কর্মের দিক থেকে দেখি তাহলে অঙ্গপ্রদেশে রয়েছে মঞ্জুষার মত  শিল্পকর্ম। যে শিল্পকর্মের সাথে যুক্ত আছে। বেহুলার গল্প। ভাগলপুরের  কথা উঠলেই সকলে বলেন, ভাগলপুরের গাভি, আর ভাগলপুরের সিল্ক। ভাগলপুরের সিল্ক এখন বিশ্ব বিখ্যাত হলেও, গাভী কমে গেছে। 

বাংলা থেকে এসে,বারবার যেটা আমার মনে হয়েছে, এত বড় একটা পর্যটনের রসদ থাকা সত্ত্বেও কেন পর্যটন  এখানে বাসা বাঁধছে না? প্রথম কারণ, অঙ্গ প্রদেশের কিছু মানুষ মনে করেন এখানে কি দেখার আছে? পর্যটন যে বড় একটি শিল্প এই ধারণাটা এখনও স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি মানুষের কাছে। পর্যটন মানচিত্রে অঙ্গ-প্রদেশকে বড় স্থান করে নেওয়ার জন্য,সব রকম রসদ তার ভেতর রয়েছে। বিহার সরকারের পর্যটন বিভাগ কেন কোন উদ্যোগ নিচ্ছেন না এটাই আমি বুঝতে পারছি না। বিহার সরকারের পর্যটন বিভাগ যদি অঙ্গপ্রদেশকে গুরুত্ব দেন, তাহলে তো আমার মনে হয় প্রচুর বিদেশী পর্যটক এই অঞ্চলে আসতে পারেন। কেন পারেন? এক বিক্রমশিলা মহাবিদ্যালয় এর মতো বিদ্যালয় কে, বৌদ্ধ সার্কিট এর মধ্যে ঢোকানো হোক। দেখবেন প্রচুর বিদেশী এখানে আসছেন। তিন রঙের যে মঞ্জুশা শিল্প এটা বিহারের মানুষই মনে হয় ভালো করে জানেন না। বিশ্ব তাকে দেখবে কিভাবে? মনমোহন সিং  প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন  অঙ্গপ্রদেশের স্থাপন করেছেন গেঞ্জেটিক ডলফিন সেন্টার। যেখানে এসে মানুষ শুধু ডলফিন দেখবেন। এই বার্তাটা পৌঁছে দেওয়ার জন্য যে প্রচার দরকার সেটা কিন্তু আমি খুঁজে পাইনি। পর্যটকদের  টেনে আনার জন্য, মানুষের কাছে বিশ্বাস অর্জন করতে হবে, আপনারা আসুন  আমরা আপনাদের সহযোগিতা করব। অঙ্গপ্রদেশে সে রকম কোনো কেন্দ্র নেই। কোথায় কি আছে দেখার জন্য কোন গাইড নেই। পর্যটনের উন্নতির সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে রাস্তাঘাট।


 সেটার দিকে নজর দিতে হবে। অঙ্গ দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে  দেখেছি না একটা ভালো  কফি সেন্টার আছে, না আছে বসার জায়গা। ভালো খাবারের দোকান করতে হবে। পর্যটক  এলে আমি জানি এগুলো সব হয়ে যাবে। 

 আমি এখানে এসে শুনেছি পর্যটন নিয়ে কোন পড়াশোনা করানো হয় না কোন কলেজে। এখানের বিভিন্ন কলেজে পর্যটনের জন্য কোর্স চালু করতে হবে। মানুষের ভেতর সচেতনতা বাড়াতে হবে। আমার ধারণা  পর্যটন শিল্পের বিকাশ হলে, অঙ্গপ্রদেশের চেহারাটারই পরিবর্তন হয়ে যাবে।

মন্তব্যসমূহ

  1. হিমালয় টুরিজ্যুমের সাথেই অঙ্গদেশ দেখার সৌভাগ্য হয়।তখন যা দেখেছি এখন ত তার থেকে একটু পরিষেবা উন্নত হয়েছে।আরও হবে সময়ের সাথে.......।

    উত্তরমুছুন
  2. আগের থেকে ত পরিষেবা অনেক উন্নত হয়েছে......।

    উত্তরমুছুন
  3. হবে তবে সময় লাগবে ।

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মধেরার সূর্য মন্দির

মিশর ভ্রমণের নান্দীমুখ।

হালিশহর এক দিনের ভ্রমণ।