শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সামতা গ্রাম।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সামতা গ্রাম।
বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায়।
দেউটি স্টেশন নেমে দাঁড়িয়েছি সামনেই দেখি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পাথরের মর্মর মূর্তি। হঠাৎ দেখাটা একটা বিস্ময় ভরে উঠলো। শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে গেল। স্টেশন থেকে বেরিয়ে কোন দুটো অটো নেই। বর্ষা জাঁকিয়ে বসেছে। ছাতা দিয়েও মাথার রক্ষা করা যাচ্ছে না। বেশ কিছুটা হেঁটে গিয়ে গাড়ি রিজার্ভ করে যেতে হবে সামতা গ্রাম। কোথায় যাবেন আমরা বললাম শরৎ বাবুর বাড়ি। যারা শরৎচন্দ্রের লেখা পড়েছেন। তার লেখায় গ্রাম বাংলার যে চিত্র ফুটে উঠেছিল সেই চিত্র যেন আমার চোখের সামনে আবার ফুটে উঠলো। গ্রামের পুকুরে হাঁস চড়ে বেড়াচ্ছে। বৃষ্টি ভেজা দিনে বাধা গরুটি তার বাচ্ছাটির গা চেটে যাচ্ছে। ভেজা পাখির ডাক কানে আসছে। বৃষ্টির দাপটে চোখের সামনে দেখলাম লিকলিকে একটা পেঁপে গাছ মাথার ভারে ভেঙে পড়লো। এই গ্রামে বাংলা সাহিত্যের অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জীবনের শেষ ক’টা বছর কাটিয়েছিলেন হাওড়া জেলার দেউলটি অঞ্চলের সামতা বেড়ে গ্রামে। গ্রামটি আজ ইতিহাসে অমর হয়ে আছে তাঁর স্মৃতির টানে।
![]() |
| স্টেশনে শরৎচন্দ্রের স্ট্যাচু |
শরৎচন্দ্রের দিদি থাকতেন সামতা গ্রামে। জায়গাটি দেখার পর। তার মনে হয়েছিল জীবনের শেষ কয়েকটা বছর যদি এখানে কাটানো যায় কেমন হয়? সেই ভাবনা থেকেই ব্যস্ত নগরজীবন ছেড়ে শরৎচন্দ্র শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশ খুঁজে পান দেউলটির সামতা গ্রামে। ঠিক বাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে রূপনারায়ণ নদী। তখন বাড়ির সামনে বাঁশ ঝাড় ছিল না। যেখানে যে ঘরে বসে তিনি লেখালেখি করতেন। সেই জানলা দিয়ে দেখা যেত নদীটিকে। নদীর প্রতি তার ছিল একটা প্রহর আকর্ষণ। হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে যেখানে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সেখানেও ছিল নদী। দীর্ঘদিন তিনি কাটিয়েছেন ভাগলপুরের মামার বাড়িতে। বাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে গঙ্গা নদী। কর্মজীবনও কেটেছিল রেগুনের সমুদ্রের ধারে।এখানে তিনি প্রকৃতির সান্নিধ্যে, গাছগাছালির সবুজ ছায়ায়, গ্রামের মানুষের সহজ-সরল জীবনের মাঝে নিজের দিনযাপন করেছিলেন। সাহিত্যের খ্যাতির মধ্যেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সহজ, সাধারণ মানুষের মতোই। গ্রামের মানুষ তাঁকে কাছে পেয়েছিল তাদের একান্ত আপনজনের মতো। এই গ্রামে শরৎচন্দ্র শুধু লেখক নয়, তিনি ছিলেন একজন ডাক্তার। বিনা পয়সায় মানুষকে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা করেছেন। শরৎচন্দ্রের আরেকটি দিক ছিল, তিনি অত্যন্ত দেশপ্রেমী ছিলেন। একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী। বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী গভীর রাতে তার বাড়িতে এসে বসবাস করেছেন। বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী তার মামা। তিনি মাঝে মাঝে গিয়ে এ বাড়িতে বসবাস করেছেন।
![]() |
| তার বাড়ি |
এই গ্রামেই তিনি শেষ জীবনের শেষ ১২ বছর কাটিয়েছেন। গ্রামীণ পরিবেশ ও জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তাঁর সৃষ্টিকে সমৃদ্ধ করেছিল। এখানেই ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে শরৎচন্দ্র তাঁর জীবনের অন্তিম পর্বের অবসান ঘটান।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাসভবনই আজ আমাদের কাছে শরৎ সদন নামে পরিচিত। শরৎ সদন একটি সংরক্ষিত স্মৃতিসৌধে রূপান্তরিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও স্থানীয় মানুষ মিলিতভাবে এটি রক্ষণাবেক্ষণ করেন।মাটির ভিতে দোতলা বাড়ি। বাড়িটির মূল কাঠামো আজও সেই সময়কার স্মৃতি বহন করছে—সাদামাটা স্থাপত্য, গ্রামীণ পরিবেশ, আর নিস্তব্ধতার আবেশ যেন লেখকের জীবনের সরলতা ও মানসিকতার প্রতিচ্ছবি।
![]() |
| বাড়ির গেট |
আজও সামতা গ্রামের মানুষ গর্বভরে স্মরণ করেন এই মহান সাহিত্যিককে। শরৎচন্দ্রের বসতবাড়ি, তাঁর স্মৃতিচিহ্ন, আর তাঁর সহজ সরল জীবনযাত্রার কাহিনি আজও সাহিত্যপ্রেমীদের আকর্ষণ করে। সামতা বেড়ে গ্রাম কেবল একটি গ্রাম নয়, তা বাংলার সাহিত্য-ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।



Nice
উত্তরমুছুন