হাম্পি।
হাম্পি।
বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায়।
কোনো এক স্তব্ধ সন্ধ্যায়, আকাশে সূর্য যখন অস্ত গিয়াছে কিন্তু নক্ষত্র পরিস্ফুট হয় নাই, সেই সন্ধিক্ষণে কৃষ্ণা ও তুঙ্গভদ্রার সঙ্গমস্থলে ত্রিকোণ ভূমির উপর দাঁড়াও । কান পাতিয়া শোনো, শুনিতে পাইবে তুঙ্গভদ্রা কৃষ্ণার কানে কানে কথা বলিতেছে , নিজের অতীত সৌভাগ্যের দিনের গল্প বলিতেছে। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা তুঙ্গ ভদ্রার তীরে। উপন্যাসটা পড়ার পর, মনে হয়েছিল এই জায়গাটা একবার দেখা দরকার। কান পেতে শোনার ইচ্ছে থাকলেও দক্ষিণ ভারতের প্রতি আমার খুব একটা প্রীতি ছিল না। বড় বড় মন্দির গুলো আমায় কোনদিনও টেনে নিয়ে যেতে পারিনি। কিন্তু হাম্পি নামটার সঙ্গে এমন একটা জাদু আছে তার টানেই চলে গিয়েছিলাম কর্নাটকে। কলকাতা থেকে ট্রেনে হাম্পি যেতে গেলে অমরাবতী এক্সপ্রেসে গিয়ে নামতে হবে হসপেট। ভোরে পৌঁছে হোটেলে গিয়ে বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পরা। আমি অবশ্য শুরু করেছিলাম মহীশূর থেকে। গিয়ে ছিলাম এ বছরের শীতের শেষে।
ভারতবর্ষের ইতিহাসে, মানচিত্রে, কর্নাটকের হাম্পি,পাট্টাডকাল,আইহলো এই জায়গা গুলোকে সে ভাবে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসা হয়নি। শুধু এখানকার ইতিহাস নয়, এখানকার রুপ টানের প্রকৃতি বড় সুন্দর। নদী লালচে পাহাড়, গুহা সবকিছু ভারতের অন্যান্য প্রান্তর থেকে আলাদা।
দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে অবস্থিত হাম্পি যেন ইতিহাসের এক জাদুকরী রাজ্য। তুঙ্গভদ্রা নদীর তীরে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ভগ্নপ্রায় মন্দির, রাজপ্রাসাদ আর পাথুরে পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের মহিমা। আমি যখন হাম্পিতে পৌঁছালাম, মনে হলো যেন সময়ের স্রোত পিছিয়ে গেছে—এক মুহূর্তে ফিরে গেছি ১৪শ শতাব্দীর সেই সোনালি যুগে।
বিরূপাক্ষ মন্দির। ৬৫০ বছরের পুরনো এই মন্দির আজও সক্রিয়—ঘণ্টার ধ্বনি, ধূপের গন্ধ আর ভক্তদের পদধ্বনি মিলেমিশে তৈরি করে আধ্যাত্মিক আবহ। এর পরেই পৌঁছলাম বিখ্যাত বিজয় বিট্ঠালা মন্দিরে, যেখানে দাঁড়িয়ে আছে হাম্পির প্রতীক সেই পাথরের রথ।
ভারতের মোট তিনটে পাথরের রথ আছে। একটা কোনারকের সূর্য মন্দিরের কাছে। দ্বিতীয়টি আছে মহাবলীপুরে। তৃতীয়টি রয়েছে হাম্পিতে।
হাম্পির রথের ছবিটা আমরা দেখতে পাই ৫০ টাকার নোটের পেছনে। মন্দিরে রয়েছে অনেক গুলো পিলার। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো স্তম্ভগুলোতে আঙুল দিয়ে ঠুকলে ভিন্ন ভিন্ন সুরের ধ্বনি হয়। নর্তকিদের নাচের সঙ্গে এগুলোকে বাজানো হতো।এজন্য এগুলোকে বলা হয় “সারগাম পিলারস”।এগুলো প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্য ও বিজ্ঞানের এক অসাধারণ উদাহরণ।
বিশাল রঙমঞ্চ (মহামণ্ডপ) তৈরি হয়েছিল ভক্তিমূলক নৃত্য ও সঙ্গীত পরিবেশনার জন্য।
এখানেই আসতেন পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে বনিকরা। এখান থেকে কিনে নিয়ে যেতেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঘোড়া, হাতি, সোনা, বিভিন্ন দামি পাথর। সেই সময় কয়েক হাজার প্রদীপ দিয়ে সাজানো হতো বিজয় বিট্ঠালা মন্দিরকে। বণিকদের থাকার জন্য তৈরি হয়েছিল ঘর। সেই ঘরগুলো ছিল বাজারের পাশেই।
হাম্পির এই মন্দিরও সূক্ষ্ম কারুকার্য, স্তম্ভে খোদাই করা নৃত্যরত দেবদেবী আর বাদ্যযন্ত্রের নকশা দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলাম।
সকালে সূর্যের আলো পড়ছিল মাতঙ্গা পাহাড়ের ওপরে। সেখান থেকে পুরো হাম্পির গ্রাম, মন্দির আর প্রাকৃতিক দৃশ্যপট যেন ছবির মতো ফুটে উঠল। দূরে তুঙ্গভদ্রা নদী সর্পিল স্রোতে বয়ে চলেছে, তার চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে লালচে রঙের বিশাল শিলা।
দেখলাম রাজপরিষদ, হাতির আস্তাবল, রানীর স্নানঘর—সবকিছুই যেন অতীতের সমৃদ্ধির নিদর্শন। কিন্তু সবচেয়ে মুগ্ধ করল সন্ধ্যার হাম্পি। সূর্যাস্তের রঙিন আলো যখন ভাঙা মন্দিরের গায়ে পড়ছিল, মনে হচ্ছিল—ইতিহাসের গহ্বর থেকে উঠে আসা কোনো কাব্যিক দৃশ্য দেখছি।
হাম্পি কেবল ভ্রমণ নয়, যেন এক অভিজ্ঞতা—যেখানে প্রকৃতি, শিল্পকলা আর ইতিহাস একসঙ্গে মিশে গেছে। হাম্পি ছেড়ে আসার সময় মনে হচ্ছিল, আমি যেন এক অসম্পূর্ণ কাহিনী পিছনে ফেলে যাচ্ছি।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন