ল্যাংভোকু জলপ্রপাত


 

ল্যাংভোকু জলপ্রপাত

বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায় 

ডিফু রেলওয়ে স্টেশনে নেমে , চায়ের দোকানে জিজ্ঞেস করলাম আমি কার্বি আংলং  যাব। মিষ্টির দোকানের মালিক আমার মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন এটাই তো সেই জায়গা,আপনি কোথায় যাবেন। আপনি তো কার্বি আংলং আছেন।
খুব ভোরে লামডিং স্টেশনে এসেচি। ভোর তখন সাড়ে চারটে। ডিপু যাওয়ার গাড়ি ৭ টা ১৫। সকাল ছয়টার আগে টিকিট কাউন্টার থেকে ডিপু যাওয়ার টিকিট দেয়া হবে না। ছটার সময় আমরা টিকিট কেটে ট্রেনে উঠে বসলাম। ট্রেনটা যে কি অসাধারণ তা বলে প্রকাশ করা যাবে না। সারা ট্রেনের গায়ে আসামের বিভিন্ন রকম সংস্কৃতি মন্দির চা বাগান এত সুন্দর করে একে রাখা হয়েছে। দেখলেই মন ভরে যাবে। 
আমরা ঠিক সাড়ে আটটার সময় এসে পৌছালাম ডিফুতে। এখান থেকে সোজা সিংহাসন হোটেলে।
আমরা ঠিক করলাম আজ দুটো জায়গা দেখতে যাব একটি জলপ্রপাত আরেকটি নদী। হোটেল থেকে বেরিয়ে চলে এলাম  মাটি বং তেনালি। এখান থেকে আমরা যাব অটো করে জলপ্রপাত দেখতে।

 
     কার্বি নিজস্ব একটা ভাষা আছে।কার্বি একটি জন জাতি। আসামে সবচেয়ে বড় জেলা বলা হয় কার্বি অ্যাংলং কে। এই ভাষার সাথে আমাদের পরিচয় নেই।   কার্বি' হলো উত্তর-পূর্ব ভারতের, বিশেষ করে আসামের একটি অন্যতম আদিবাসী তিব্বত-বর্মন জাতিগোষ্ঠী (পূর্বে 'মিকির' নামে পরিচিত ছিল)  আক্ষরিক অর্থে, কার্বি বলতে বিশেষ করে কার্বিস সংস্কৃতির 'কানের দুল' বোঝানো হয় এবং এটি রাইস বিয়ারের সাথে সম্পর্কিত একটি প্রাচীন ঐতিহ্যকে নির্দেশ করে । আবার কেউ কেউ বলেন,কার্বি আংলং-এর কার্বি শব্দটি দ্বারা 'কার্বি জনগণের পাহাড়' বোঝানো হয়। কার্বি” শব্দটির অর্থ নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে, তবে সাধারণভাবে এটি তাদের জাতিগত পরিচয়কেই নির্দেশ করে। “আংলং” শব্দের অর্থ পাহাড় বা উঁচু ভূমি—তাই “কার্বি আংলং” মানে দাঁড়ায় “কার্বিদের পাহাড়ি ভূমি”।
ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দিতে যেটুকু বোঝাতে পারলাম তাতে করেই আমাদের কাজ চলে গেল।  এখানকার গাড়ি ভাড়া বড্ড বেশি। শুধু গাড়ি ভাড়া বলব কেন হোটেলও কিছু কম যায় না। তাদের দর টাও প্রায় আকাশ ছোঁয়া।
অসাধারণ পথঘাট, উঁচু নিচু পাহাড়। চারিপাশে রাবার গাছ। লালমাটি। দরমার ঘর, আর মাথায় বিচুলির ঝাউনি। এসব দেখতে দেখতে আমরা গিয়ে পৌঁছলাম ল্যাংভোকুতে। সেখান থেকে আমাদের যেতে হবে হেঁটে হেঁটে জলপ্রপাতের দিকে। চারিপাশে বাঁশ গাছ। এখানে প্রতিটি জায়গায় লেখা রয়েছে বাঁশ কাটলে বা সেই গাছের কোন ক্ষতি করলে পাঁচ হাজার টাকা ফাইন।
একটা ছোট্ট ব্রিজ পেরিয়ে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। কিছু দূর যাওয়ার পরে আমরা জলপ্রপাতের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। জায়গাটা বড় ভয়ংকর। কিছুটা যাওয়ার পর বড় বড় বোল্ডর, সেটাকে টপকে গিয়ে আরও একটা ভয়ংকর পরিস্থিতি। সরু পাটাতন তার ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে হবে। কোন কারনে পা যদি একবার ফসকে যায় তাহলে কি হবে সে দৃশ্যটা চোখ বুজে ভাবুন।
কেন এ কথা বলছি , তার একটা কারণ আছে। পাথরের ওপর আমি এমন ভাবে পড়লাম অনুক্রমে আমি বেঁচে গেছি। আমার চশমা এদিকে আমি একদিকে আমার ক্যামেরা একদিকে। আমাকে তোলার কোন লোক নেই। কিছুক্ষণ সে রকম ভাবে শুয়ে থেকে তারপর আস্তে আস্তে উঠে আবার জলপ্রপাতের দিকে রওনা হলাম। ল্যাংভোকুত জায়গার নাম অনুসারে জলপ্রপাত টির নামও ল্যাংভোকু।


আমি জীবনে অনেক রকম জলপ্রপাত দেখেছি। কিন্তু এখানে এসে মনে হল এরকম বুনো জলপ্রপাত আমি জীবনে কোনদিন দেখিনি। বুনো গন্ধ তার  ভেতর থেকে রুপোর জলরাশি নেমে আসছে পাথরের উপর। সিংহের গর্জন নয় এ গর্জন অচেনা কোন এক জন্তুর। উপর থেকে পড়ে নিচে যখন সেটা আসছে তার মধ্যে কোন গভীরতা নেই সেই স্বচ্ছ জলে সকলেই অবগাহন করতে পারেন।

জলপ্রপাতটির কাছে পৌঁছালে প্রথমেই চোখে পড়ে তার স্বচ্ছ জলের ধারা, যা পাথরের গা বেয়ে নেমে এসে নিচে একটি শান্ত, নীলাভ পুল তৈরি করেছে। চারপাশে উঁচু গাছ আর শ্যামল সবুজে ঘেরা এই জায়গাটি এতটাই নির্মল যে শহরের কোলাহল যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। অনেকেই এখানে এসে জলের ঠান্ডা ছোঁয়ায় নিজেকে সতেজ করে নেন—গরমের দিনে এটি সত্যিই এক স্বর্গীয় অনুভূতি।
এই অঞ্চলের আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো এর সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য। হর্নবিল পাখির ডানা মেলা, নানা রঙের প্রজাপতির উড়াউড়ি, আর অরণ্যের নিঃশব্দ জীবন—সবকিছু মিলিয়ে ল্যাংভোকু যেন প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য এক আদর্শ গন্তব্য। যারা ফটোগ্রাফি ভালোবাসেন, তাদের জন্যও এটি এক অসাধারণ স্থান। কি করে আসবেন বলি। হাওড়া থেকে সরাসরি কামরূপ এক্সপ্রেসে দিফু চলে আসতে পারবেন। আর একটা সহজ কথা বলে দিই আমরা যাচ্ছি টিম নিয়ে আগামী আটই জুন।
যদি কেউ যেতে চান যোগাযোগ করতে পারেন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মধেরার সূর্য মন্দির

মিশর ভ্রমণের নান্দীমুখ।

হালিশহর এক দিনের ভ্রমণ।